মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনে কূটনৈতিক আলোচনার তোড়জোড় শুরু হলেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোয় নতুন হামলার দাবি করা হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর দিনের শুরুর দিকে তেলের দর প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। তবে পরবর্তীতে বাজার ঘুরে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টা ১৮ মিনিটের হিসেবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪০ সেন্ট বা ০.৪ শতাংশ বেড়ে ১১৬.২৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)-এর দাম ৩০ সেন্ট বা ০.৩ শতাংশ বেড়ে ১০২.০৭ ডলারে পৌঁছেছে। উল্লেখ্য, সোমবারও উভয় ধরনের তেলের দামের প্রায় ১ শতাংশ দরপতন হয়েছিল।
জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা প্রসঙ্গে নয়াদিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসএস ওয়েলথস্ট্রিটের প্রতিষ্ঠাতা সুগন্ধা সচদেব বলেন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি, তাই তেলের দাম উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। দিনের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার অগ্রগতির খবরে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতায় কিছুটা নিম্নমুখী চাপ থাকলেও, পরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সোমবার তেহরানে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, চার দেশ শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে একমত হয়েছে। তবে শান্তি আলোচনার এই সম্ভাবনা এখনো বেশ নাজুক। গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে ধারাবাহিক হামলার পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা চলতি বছরের এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ।
ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি গবেষণা সংস্থার তথ্যানুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসে হরমুজ প্রণালি ও পার্শ্ববর্তী জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়েছে। ২০১৭ সালের পর থেকে সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অক্টোবর মাসটি সবচেয়ে সংকটময় হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয় এই সরু জলপথ দিয়ে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের প্রবাহ স্বাভাবিকের তুলনায় ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১৭ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি যেসব সামুদ্রিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছে, সেগুলোর মধ্যে চলতি অক্টোবর মাসে এ অঞ্চলে হামলার পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।
এএনজেড রিসার্চের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তেল উত্তোলনের উৎস থেকে শুরু করে পরিশোধন ও মজুত—সবক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি টানা চার সপ্তাহ ধরে কমছে। এছাড়া বিশ্ববাজারে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত গত পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম রয়েছে। সব মিলিয়ে, কূটনৈতিক আলোচনা কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার ঝুঁকি বিশ্ববাজারে দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তা ধরে রেখেছে। এতে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

















