অপ্রতিমের বয়স ছিল মাত্র তেরো। এই একটি সংখ্যা আজ যেন শহরের প্রতিটি সরকারি ভবনের দেয়ালে এক বিশাল ব্যর্থতার চিহ্ন হয়ে ফুটে আছে। তেরো বছর বয়সে একটি ছেলের জীবনের স্বাভাবিক গতিপথ হওয়ার কথা ছিল স্কুলের মাঠ, সহপাঠী, মায়ের হাতের রান্না কিংবা পরীক্ষার খাতা নিয়ে হাজারো স্বপ্ন। কিন্তু বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা তাকে তার অনাগত ভবিষ্যৎসহ গিলে ফেলেছে। আজ আমরা সবাই যেন সভ্য সেজে বসে তার মৃত্যুর কারণ খুঁজছি, কিন্তু এই কৃত্রিম সহানুভূতি মৃত শিশুকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
অপ্রতিমের পরিবারের জন্য কোনো স্মৃতিসৌধ, ফুলের মালা কিংবা উচ্চপদস্থ কোনো মন্ত্রীর সান্ত্বনা প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রের ক্যামেরার সামনে করা এসব লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যখন কোনো শিশু নিখোঁজ হয়, তখন কেন রাষ্ট্রযন্ত্র তাৎক্ষণিকভাবে তার সন্ধানে জেগে ওঠে না? মন্ত্রীরা প্রায়শই কবিতা বা সাহিত্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, অথচ একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা নোটিশ দেখা যায় না।
প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও মায়ের কাছে তা কেবলই বিমূর্ত শব্দ। মায়ের কাছে আইনের আসল অর্থ হলো সন্তানের পায়ের আওয়াজ, যা অপ্রতিমের ঘরের দরজায় আর কোনোদিন শোনা যাবে না। বর্তমান প্রশাসনিক ও বিচারিক কাঠামো আজ সেই তেরো বছরের কিশোরের শূন্য বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে অসহায়। আমি কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে সরাসরি অপরাধী করছি না; তবে সামাজিক নীরবতা এবং রাজনৈতিক সুবিধাবাদকে অভিযুক্ত করছি। এমন এক অভ্যাস গড়ে উঠেছে যেখানে একটি শিশুর মৃত্যু মাত্র কয়েক ঘণ্টার সংবাদ শিরোনাম হয়, আর পরদিন আমরা আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যাই।
অপ্রতিম নির্দিষ্ট কোনো দল, পতাকা বা রাজনৈতিক আদর্শের ছিল না; তার পরিচয় ছিল কেবলই একজন মানুষ হিসেবে। মৃত শিশুর পাশে দাঁড়িয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা যারা করছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ—এই সুযোগসন্ধানী রাজনীতি থেকে দূরে থাকুন। আজ অপ্রতিমের স্কুলব্যাগটি এক কোণে পড়ে আছে, তার বইয়ের পাতাগুলো বন্ধ এবং কলমটি কোনো এক অসমাপ্ত বাক্যের মাঝপথে থেমে গেছে। রাষ্ট্র কি এমন এক অনিশ্চিত জনপদ তৈরি করেছে, যেখানে তেরো বছরের শিশুরাও পূর্ণ নিরাপত্তা ছাড়া ঘর থেকে বের হতে পারে না? এই দীর্ঘ প্রশ্নটিই আজ অপ্রতিমের নিথর শরীর আমাদের দিকে ছুড়ে দিয়েছে।

















