প্রতিষ্ঠার প্রায় তিন দশক পর বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জোট বিমসটেকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা প্রথমবারের মতো মুখোমুখি বৈঠকে বসছেন। আগামী মঙ্গলবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য এই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যোগ দিচ্ছেন না। তাঁর অনুপস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নেবে। গত ৪ অক্টোবর বিমসটেক সচিবালয়ে পাঠানো এক কূটনৈতিক চিঠিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। ৪ অক্টোবর বিমসটেক সচিবালয়ে পাঠানো ওই চিঠিতে ১২ ও ১৩ অক্টোবরের বৈঠকের জন্য চার সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নাম জানানো হয়।
বিমসটেকের মহাসচিব ইন্দ্রমণি পান্ডে রোববার দিল্লি থেকে মুঠোফোনে জানান, বাংলাদেশ বাদে জোটের অন্য ছয় সদস্যদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা এই বৈঠকে সশরীরে অংশ নিচ্ছেন। মূল বৈঠকের ঠিক একদিন আগে অর্থাৎ ১২ অক্টোবর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রথম পর্যায়ের আলোচনা শুরু হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফরে না যাওয়ার নেপথ্যে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কের টানাপোড়েন বড় একটি ভূমিকা পালন করছে বলে সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেননি। যদিও বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তবে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছিল যে, সেই আমন্ত্রণটি বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে নয়, বরং বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে পাঠানো হয়েছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাতটি দেশ—বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে ১৯৯৭ সালের ৬ জুন বিমসটেকের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এই জোটের সচিবালয় ঢাকায় অবস্থিত এবং বাংলাদেশ গত বছরের এপ্রিলে সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে। সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিদের নাম চূড়ান্ত হয়েছে, বাকি তিন দেশ মিয়ানমার, নেপাল ও থাইল্যান্ডকে দ্রুত নাম পাঠানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এদিকে ৫ অক্টোবর সদস্যদেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো বিমসটেক সচিবালয়ের একটি জরুরি চিঠি থেকেও বৈঠকের প্রস্তুতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর সদস্যদেশগুলোর কাছে মনোনয়ন চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল বিমসটেক সচিবালয়।
দিল্লির এই বৈঠকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সভাপতিত্ব করবেন। এর আগের দিন ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠক পরিচালনা করবেন। অন্যান্য দেশের প্রতিনিধি হিসেবে ভুটানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুংতেন দর্জি, মিয়ানমারের জেনারেল কো কো ও, নেপালের সুদান গুরুং, শ্রীলঙ্কার চন্দনা আবেরত্নে এবং থাইল্যান্ডের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংসাক থংস্রির উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
বৈঠকের মূল আলোচ্যসূচিতে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ দমনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মানব পাচার, মাদক চোরাচালান, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। গত ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে বিমসটেকের সন্ত্রাসবাদ দমন ও আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক যৌথ কার্যকরী দলের যে একাদশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তার সুপারিশ ও প্রতিবেদনগুলোও এবারের মন্ত্রিপর্যায়ের আলোচনায় পেশ করা হবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সুহেল এজাজ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে নিরাপত্তা হুমকি ও উগ্রবাদ মোকাবিলার ওপর ব্যাপক আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দিল্লির বৈঠকে এ অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ ও আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৯ সেপ্টেম্বরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ওই বৈঠকে বাংলাদেশসহ সাত সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের আগস্টে কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত জোটের চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়মিত বৈঠকের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিমসটেকের ২০তম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এই বৈঠকের ধারণাপত্রটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। কাঠমান্ডু ঘোষণার ধারাবাহিকতায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান বৃদ্ধির অঙ্গীকার থাকলেও দীর্ঘ আট বছর পর এবারই প্রথমবারের মতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের এই বৈঠকটি বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে।

















