শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত জাফনার চেম্মানি এলাকায় দীর্ঘদিনের রহস্যঘেরা একটি স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ চালিয়ে ৫৭২ জনের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। এটি দেশটিতে এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে বড় গণকবরের নিদর্শন বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে একটি শ্মশান সম্প্রসারণের কাজ চলার সময় মাটি খুঁড়তে গিয়ে প্রথমবারের মতো এসব দেহাবশেষের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। আগস্ট মাসের শেষ নাগাদ খননকাজের তৃতীয় পর্যায় সমাপ্ত হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তিগত সামগ্রীও পাওয়া গেছে, যার মধ্যে রয়েছে চুড়ি, স্কুলব্যাগ এবং অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিস। প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক রাজ সোমদেব জানিয়েছেন, পুরো প্রক্রিয়াটির একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে আদালতে দাখিল করা হবে। দেহাবশেষগুলোর সময়কাল এবং মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ে ফরেনসিক বিশ্লেষণ চলমান রয়েছে। তবে বর্তমানে পাওয়া সব কঙ্কাল জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগের হেফাজতে রাখা হয়েছে।
চেম্মানির এই এলাকাটি কয়েক দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধের সময় কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে ছিল। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে গৃহযুদ্ধ চলাকালীন এক তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত এক সেনাসদস্য সোমারাত্নে রাজাপাক্ষে আদালতে এই গণকবরের বিষয়ে প্রথম ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, ওই সময়ে সেখানে ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষকে সমাহিত করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এর কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি যেখানে দেহাবশেষ পাওয়া গেছে, তার ১০০ মিটারের মধ্যেই ছিল কৃষান্তি কুমারস্বামী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের দেহাবশেষ পাওয়ার স্থান।
নিখোঁজদের পরিবারগুলোর জন্য এই উদ্ধারকাজ নতুন করে শোক ও উত্তরের প্রত্যাশা নিয়ে এসেছে। ১৯৯৬ সালে নিখোঁজ হওয়া কান্দাইয়া জয়পালানের মেয়ে জেয়ারুবি জয়পালান জানান, তাঁর বাবা স্থানীয়ভাবে একটি ছোট ব্যবসা করতেন এবং সরকারি কর্মচারী ছিলেন। বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর তারা জাফনার প্রতিটি সেনা ক্যাম্প ও থানায় হন্যে হয়ে ঘুরেছেন, কিন্তু কোনো তথ্য পাননি। জেয়ারুবি আশা প্রকাশ করেন, এই তদন্তের মাধ্যমে হয়তো তারা তাদের স্বজনদের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর পাবেন।
সুসিলা নামের আরেক ভুক্তভোগী মা জানান, ২০০৭ সালে তাঁর ২৪ বছর বয়সী ছেলে জ্ঞানাসীলান নিখোঁজ হন। তিনি বারবার চেম্মানির ওই স্থানটি পরিদর্শন করেছেন, কিন্তু ব্যক্তিগত কোনো পরিচয়সূচক বস্তু না পাওয়ায় এখনো অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এমন হাজারো পরিবারের স্বজনরা এখন ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছেন।
শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার গেহান গুনাতিলেকে গত বছর স্থানটি পরিদর্শন করে জানিয়েছিলেন, এটি সাধারণ কোনো সমাধি নয়। কাপড়বিহীন অবস্থায় পাওয়া বেশিরভাগ দেহাবশেষই ভিন্ন প্রেক্ষাপটের দিকে ইঙ্গিত করে। কমিশন আগেই মত দিয়েছিল যে, এসব সমাধি অবৈধ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
আন্তর্জাতিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই মাসের শুরুতে একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশটিতে গুম, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বহু মামলা দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে। জাতিসংঘও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত ও দায়ীদের চিহ্নিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের হাইকমিশনারের কার্যালয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান রোরি মাঙ্গোভেন মন্তব্য করেছেন, ভুক্তভোগীরা দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পরেও যথাযথ বিচারের অভাবে চরম হতাশ।
বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচার ও জাতিগত পুনর্মিলনের কথা বলা হলেও, যুদ্ধকালীন নৃশংসতার আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবির প্রতি অনীহা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের প্রশাসন জানিয়েছে, তারা চেম্মানির তদন্তে সব ধরনের সহায়তা দেবে। বিচারমন্ত্রী হর্ষণা নানায়াক্কারা জানিয়েছেন, খননকাজ অব্যাহত থাকবে এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের চেষ্টা চালানো হবে।
অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী এই গণকবরের সঙ্গে কোনো ধরনের গণহত্যার সম্পৃক্ততার অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার ওয়ারুনা গামাগে জানিয়েছেন, কোনো দাবি থাকলে তা আদালতে যথাযথ প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
উল্লেখ্য যে, ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধে আনুমানিক এক লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ২৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। জাফনা উপদ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষ গুমের অভিযোগ অনেক পুরনো। ২০১৮ সালে মান্নারে আবিষ্কৃত ৩৫০ জনের অধিক দেহাবশেষের ঘটনার পর চেম্মানির এই উদ্ধারকাজ দেশটিতে জবাবদিহিতার দাবিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন এই তদন্ত প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আওতায় নেওয়ার দাবি তুলছে। কারণ, স্থানীয় সরকারি সংস্থাগুলোর তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা এবং নিরপেক্ষতার অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অধিকারকর্মীরা সমালোচনা করে আসছেন।
নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের অনেক ক্ষেত্রে ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে। সব মিলিয়ে, চেম্মানি গণকবর থেকে উদ্ধার হওয়া তথ্য শুধু শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের অন্ধকার অধ্যায়ই নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী বিচারহীনতার এক করুন দৃষ্টান্ত হিসেবেও আলোচনায় রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত ফেব্রুয়ারিতে একটি শ্মশান সম্প্রসারণের জন্য শ্রমিকেরা মাটি খননের সময় হঠাৎ মানবদেহের অবশিষ্টাংশ দেখতে পান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চেম্মানির এই গণকবরের অস্তিত্ব নিয়ে আগে থেকেই নানা গুঞ্জন ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অধিকারকর্মী গোষ্ঠীগুলোর ধারণা, নিখোঁজ হওয়া বেসামরিক মানুষের মরদেহ সেখানে থাকতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নতুন করে ৫৭২ জনের কঙ্কালাবশেষ উদ্ধারের ঘটনায় নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারগুলোর মধ্যে একদিকে যেমন ক্ষোভ বেড়েছে, অন্যদিকে উত্তর পাওয়ার আশাও তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে জেয়ারুবির বয়স ছিল ১২ বছর। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি বলেন, চেম্মানি এলাকার কাছে একটি চেকপয়েন্ট থেকে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী তাঁর বাবাকে আটক করে নিয়ে যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরপর তাঁর বাবার কী হয়েছিল, পরিবারটি আর জানতে পারেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁরা জাফনার বিভিন্ন সেনা শিবির ও পুলিশ স্টেশনে ঘুরে তথ্যের সন্ধান করেছিলেন।

















