ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও সমাজের গণতান্ত্রিক বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইউরোপীয় শক্তিগুলো আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নির্মম কৌশল অবলম্বন করেছিল। মধ্য নভেম্বরে ইনকা সম্রাট আতাহুয়ালা এবং পিজারোর বাহিনীর সৌজন্যমূলক সাক্ষাতের ঘটনাটি ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত উদাহরণ। সেখানে পিজারোর দেড় শতাধিক সশস্ত্র সঙ্গী ইনকা সম্রাটের সামনে বাইবেল উপস্থাপন করে খ্রিষ্টধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের দাবি করে এবং শেষপর্যন্ত সম্রাটকে বন্দি করে নির্মম হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নেয়।
ইনকা সম্রাটকে মুক্ত করার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে পিজারো বাহিনী একটি ঘরভর্তি সোনা ও কয়েকটি ঘরভর্তি রূপা হাতিয়ে নেয়, যা বর্তমান বাজার মূল্যে প্রায় অর্ধ-বিলিয়ন ডলারের সমান। সম্পদ লুটের পর ১৫৩৩ সালের আগস্টে সম্রাটকে ফ্রান্সিসকো পিজারো নাম দিয়ে একটি যন্ত্রের সাহায্যে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার মাধ্যমে ইনকা সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক পতনের প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা ১৫৭২ সালের মধ্যে চূড়ান্ত রূপ পায়।
উত্তর আমেরিকায় ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের ধারাটিও ছিল একইভাবে রক্তক্ষয়ী। ১৬০৭ সালের মে মাসে ভার্জিনিয়া কোম্পানির অধীনে ১০৪ জনের একটি সশস্ত্র দল জেমসটাউনে বসতি স্থাপনের নামে উপস্থিত হয়। স্থানীয় পাওহাটান জনগোষ্ঠীর সাথে সংঘাতের সময় ইংরেজরা নির্মমতার আশ্রয় নেয়। বিশেষ করে ১৬১০ সালের শীতে চরম খাদ্যাভাবের শিকার হওয়ার পর, ইংরেজরা প্রতিশোধ নিতে গিয়ে স্থানীয়দের বাড়িঘর পুড়িয়ে ফেলে, শস্য ধ্বংস করে এবং রানী ও তার সন্তানদের অপহরণ করে নদীতে নিক্ষেপ ও হত্যা করে।
ফরাসি সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল মন্তানিয়াক (১৮০৩-১৮৪৫) আলজেরিয়ায় উপনিবেশ স্থাপনের সময় যে ধরনের গণহত্যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা ইউরোপীয় শক্তিগুলোর নগ্ন আধিপত্যবাদেরই প্রমাণ। তিনি চিঠিতে লিখেছিলেন যে, যারা আনুগত্য স্বীকার করবে না, তাদের সর্বস্ব লুট করে ধ্বংস করে দেওয়া হবে। এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় সভ্যতা বিস্তারের নামে আসলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
এই প্রক্রিয়ায় খ্রিষ্টধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পোপের ১৪৯৩ সালের আনুষ্ঠানিক ফতোয়াগুলো নতুন ভূখণ্ড দখলের বৈধতা দেয়। এছাড়া গীতসংহিতার ২:৮ এবং রোমীয় ১৩:১-২ বাণীর অপব্যাখ্যা দিয়ে ঔপনিবেশিক শোষণের ধর্মীয় বৈধতা খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। শাসন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে তারা মূলত বিভাজন, লুটতরাজ ও গণহত্যার মতো তিনটি সাধারণ অপকৌশল ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি- ৫। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্রাট আতাহুয়ালা সোটোর প্রার্থনা মঞ্জুর করলে, মধ্য নভেম্বরে, পিজারোর দলটি কাজামারকা নগরে প্রবেশ করে এবং পরদিনই নগরীর কেন্দ্রীয় উন্মুক্ত চত্বরে উভয় পক্ষের সৌজন্য সাক্ষাতের আয়োজন করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্রাট আতাহুয়ালা রাজকীয় পোশাকে, খোস মেজাজে, একটি স্বর্ণখচিত বহনযোগ্য সিংহাসনে চড়ে, উৎসবের ঝলমলে পোশাক পরিহিত পারিষদবর্গ ও স্থানীয় পোশাকি অস্ত্রে সজ্জিত প্রহরীর দল সমভিব্যাহারে যথাস্থানে হাজির হন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পিজারোর দলের সঙ্গে এই সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকে ইনকা সম্রাট একটি নিতান্তই ‘ধর্মীয় আচার’ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, ফলে তার সেনাদলকে নগরের দূরবর্তী প্রান্ত অঞ্চলে অবস্থানের নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্যদিকে, পিজারো ও তার দেড় শতাধিক সঙ্গীর দল সেখানে পুরোপুরি সশস্ত্র অবস্থায় হাজির হয় এবং সাক্ষাৎ হওয়ামাত্র পিজারোর একজন দলসঙ্গী, খ্রীষ্টধর্মের এক যাজক, নিজেদেরকে ‘আসল’ ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করে, সম্রাট আতাহুয়ালপার হাতে একটি বাইবেল তুলে দিয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই অনাকাঙ্ক্ষিত সব প্রস্তাবে ইনকা সম্রাট বিস্মিত, অপমানিত ও রাগান্বিত হয়ে প্রত্যাখ্যান করলে, সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য ইতিপূর্বে প্রস্তুত পিজারোর দল প্রায় নিরস্ত্র ইনকা সম্রাট ও তার পরিষদবর্গের ওপর রক্তাক্ত হামলা পরিচালনা করে সম্রাটকে বন্দি করে ফেলতে সমর্থ হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এভাবেই, ওয়েলম্যানের ভাষায়, ‘ইনকা সম্রাটের আপ্যায়নের ঋণ রক্ত নিয়ে পরিশোধ করা হয়’।২১।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৯৭
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৯৮
- হাওয়ার্ড জিন, আ পিপলস হিস্টোরি অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস, পৃষ্ঠা ১০
- কর্নেল মন্তানিয়াককে উদ্ধৃতির জন্য দেখুন, এমে সেজেইর, ডিসকোর্স অন কলোনিয়ালিজম, পৃষ্ঠা ৪
- লুসিয়েন দে মন্তানিয়াকের জীবনী বিষয়ক তথ্যসূত্র
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৩
- হাওয়ার্ড জিন, আ পিপলস হিস্টোরি অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস, পৃষ্ঠা ১৪; গীতসংহিতা ও রোমীয় বাণীর ব্যবহার বিষয়ক তথ্য











