সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটির এক দীর্ঘ বৈঠকে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন এবং নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টার এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশেষজ্ঞ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপকরা অংশ নেন। কমিটির পক্ষ থেকে ৬০ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত ৪৪ জন উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত সদস্যদের সূত্রে জানা গেছে, তার প্রস্তাবে অনেকে সমর্থন জানান।
বৈঠকে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। প্রস্তাব অনুযায়ী, উচ্চকক্ষের মোট সদস্য সংখ্যা হতে পারে ১০৫ জন। এর মধ্যে ৫০ জন নির্বাচিত হবেন সরাসরি সংসদীয় আসনের অনুপাতে, অন্য ৫০ জন নির্বাচিত হবেন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে। অবশিষ্ট পাঁচজন সদস্যকে রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দেবেন। প্রস্তাবদাতার দাবি, এই কাঠামো কার্যকর করা সম্ভব হলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হবে।
উচ্চকক্ষ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উপস্থাপন করেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষাবিদ। আরও প্রস্তাব পাওয়ার পর বিষয়গুলো কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, উচ্চকক্ষের স্পিকারের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা যেতে পারে। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ তৈরি করা উচিত, যেখানে উচ্চকক্ষের স্পিকার পদাধিকারবলে দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া সরকার ও বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে অন্যান্য উপদেষ্টাদের উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
একই বক্তা সংসদের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে নিম্নকক্ষের মেয়াদ চার বছর এবং উচ্চকক্ষের মেয়াদ ছয় বছর করার প্রস্তাব দেন। এতে একটি সংসদ ভেঙে গেলেও অন্যটির অস্তিত্ব বহাল থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বর্তমানে সরকারি দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, আর প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ভোটের অনুপাতে প্রতিনিধি নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছে।
বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো ও কর্মপরিধি নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। স্পিকারের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়টি বিবেচনার সুযোগ আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে বিষয়টি চূড়ান্ত নয়। তিনি জানান, এখনো এক বা দুটি বৈঠক বাকি রয়েছে এবং সব প্রস্তাব সংকলন করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
বিচার বিভাগের সংস্কার ও স্বাধীনতা নিয়েও বৈঠকে গভীর আলোচনা হয়। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিচারিক পর্যালোচনার পরিধি নিয়ে মতামত দেন বিশেষজ্ঞরা। এ সময় বিভিন্ন দেশের বিচার বিভাগের এখতিয়ার সংক্রান্ত উদাহরণ তুলে ধরা হয়। বিচারক নিয়োগে নতুন আইন প্রণয়ন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ১১৬ অনুচ্ছেদ নিয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রস্তাবগুলো সংকলনের কাজ শুরু হয়েছে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়টিও বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। প্রস্তাব অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধন, অর্থবিল, আস্থা ভোট এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয় ছাড়া সংসদ সদস্যরা যেন অন্য সব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন, সেই ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে সদস্যদের মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।

















