ঠাকুরগাঁওয়ে অবস্থিত বেসরকারি সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন বা ইএসডির প্রধান কার্যালয় এলাকায় একটি বনবিড়াল দেখতে পাওয়া গেছে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামানের অনুরোধে কয়েক একর জমিতে দেশের সব প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করে একটি দুর্লভ গাছের উদ্যান তৈরির কাজ চলছে। সেই প্রকল্পের কাজের তদারকি এবং নতুন চারা রোপণের জন্য অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সেখানে গিয়ে এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন লেখক। কারও ধারণা, বনবিড়াল ডাকলে অমঙ্গল ঘটে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন বনবিড়ালকে শুধু ছবিতেই না দেখে, প্রকৃতিতেও দেখতে পায়, সেই চেষ্টাও আমাদের করতে হবে। লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
একই এলাকায় খ্যাঁকশিয়াল পর্যবেক্ষণের সময় আলোকচিত্রী রেজাউল হাফিজ রাহীর সঙ্গে বনবিড়ালটির দেখা মেলে। প্রথমে সূর্যের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে এটিকে পাতিশিয়াল মনে হলেও, পরে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি একটি বনবিড়াল। প্রাণীটি নদীর তীরবর্তী নির্জন জঙ্গলের পাশে আখের ক্ষেতে বিচরণ করছিল। সেখানে কিছু বড় বড় গাছ থাকায় এলাকাটি বেশ ছায়াঘেরা এবং শান্ত। বনবিড়ালটি কিছুক্ষণ মাটিতে বসে বিশ্রাম নিয়ে পুনরায় জঙ্গলের দিকে চলে যায়, যা ছবি তোলার সুযোগ করে দেয়। আমাদের খুব কাছেই একটি স্ত্রী খ্যাঁকশিয়াল বসে আছে, হাঁটাহাঁটি করছে। অতিপ্রাকৃত কিছু নয়, বরং চারপাশের নিস্তব্ধতাই জায়গাটিকে অন্য রকম করে তুলেছে। যেসব এলাকায় এখনো বনবিড়ালের দেখা মেলে, সেখানকার মানুষের দায়িত্ব প্রাণীটিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং এর বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা। যে জঙ্গলে বনবিড়ালটির দেখা পেলাম, সেটি আর কত দিন টিকে থাকবে, তা বলা কঠিন। এমনও হতে পারে, এটাই ছিল আমার শেষ দেখা। এ থেকেই বোঝা যায়, প্রাণীটি কতটা দুর্লভ হয়ে উঠেছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে বনবিড়াল ও তার আবাসস্থল সংরক্ষণে আমাদের সবার আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
চল্লিশ বছর আগেও গ্রামের মানুষের কাছে বনবিড়াল বেশ পরিচিত একটি প্রাণী ছিল। তখন হাঁস-মুরগি কিংবা ছাগলের বাচ্চা শিকারের ঘটনায় তাদের উপস্থিতি প্রায়ই টের পাওয়া যেত। অঞ্চলভেদে এটি রংপুরের কোথাও ‘গাড়োয়া’ আবার কোথাও ‘বাড়বিলাই’ নামে পরিচিত ছিল। গ্রামের কাছের ঝোপঝাড় বা বাঁশঝাড় ছিল এদের আশ্রয়স্থল। যদিও অনেকে এদের ডাককে অশুভ মনে করেন বা মাংস খেলে ব্যথা কমে এমন কুসংস্কারের চর্চা করেন, তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এসবের কোনো ভিত্তি নেই। একসময় দেখি, প্রায় ২০০ গজ দূরে একটি বড় প্রাণী হেঁটে যাচ্ছে। দেখলাম, বড়সড় একটি বিড়াল হেঁটে যাচ্ছে। এটি যে পোষা বিড়াল নয়, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। সন্ধ্যায় ‘বাব, বাব’ স্বরে একধরনের ডাক দিত। অনেক অঞ্চলে বনবিড়ালের ডাককে কুডাক বলে মনে করা হয়।
বর্তমান সময়ে বনবিড়াল দেখার সুযোগ কমে আসার প্রধান কারণ আবাসস্থলের সংকট। জঙ্গল উজাড় হওয়ায় এরা খাদ্যের সংকটে ভুগছে; এরা মূলত ইঁদুর ও ছোট পাখি খেয়ে জীবন ধারণ করে। অধিকাংশ সময় দেখা পাওয়া মাত্রই মানুষ দল বেঁধে এদের পিটিয়ে মেরে ফেলে। অথচ এই স্তন্যপায়ী প্রাণী, যার ইংরেজি নাম জঙ্গল ক্যাট (वैज्ञानिक নাম Felis chaus), মানুষের ওপর আক্রমণ করে না। এদের গায়ের রঙ ধূসর-বাদামি এবং পায়ে ও লেজে ডোরাকাটা দাগ থাকে, মুখে থাকে সাদা গোঁফ।
আলোকচিত্রী রেজাউল হাফিজ রাহী দীর্ঘ সময় ধরে প্রকৃতি নিয়ে কাজ করলেও, এই প্রথম তিনি একটি বনবিড়ালের ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছেন, যা প্রাণীটির দুর্লভতার প্রমাণ দেয়। বনবিড়াল গাছে উঠতে ও সাঁতারে দক্ষ হলেও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে এরা এখন অস্তিত্বের সংকটে। প্রকৃতিতে এদের টিকে থাকা ও বংশবিস্তার নিশ্চিত করতে জনসচেতনতা এবং পরিবেশ রক্ষা অত্যন্ত জরুরি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রকৃতিতে বনবিড়ালের উপস্থিতি নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তারপরও সেদিনই জীবনে প্রথমবারের মতো বনবিড়ালের ছবি তুললেন তিনি।

















