ইরানে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলার আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে। গোয়েন্দা ও গণমাধ্যমের নানা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানকে লক্ষ্য করে নতুন অভিযানের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। চলমান কূটনৈতিক স্থবিরতার মধ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরকে পাল্টাপাল্টি হুমকির মুখে রেখেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। প্রায় আট মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বর্তমানে আলোচনা স্থবির হয়ে আছে। এ পরিস্থিতিতে দুই পক্ষই হামলার পাল্টাপাল্টি হুমকি দিচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, মধ্যপ্রাচ্য কি তাহলে আবার বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় গত বুধবার আইআরজিসি (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর) তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা কৌশলে পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি জানান, আগে তাদের নীতি ছিল কেবল আত্মরক্ষামূলক, অর্থাৎ কোনো পক্ষ আক্রমণ করলে তার জবাব দেওয়া হতো। কিন্তু এখন তারা আক্রমণাত্মক ও অসমতাভিত্তিক (অফেনসিভ অ্যান্ড অ্যাসিমেট্রিক) সামরিক নীতি গ্রহণ করছে। প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও সামরিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে এবার শুধু পাল্টা–আঘাত হেনেই থেমে থাকবে না ইরান, প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশগুলোয় সামরিক অভিযান চালাবে। হামলা চালানো হবে মার্কিন সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত ঘাঁটিগুলোতেও। নিজেদের সামরিক নীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়ে এমনই হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। আমরা বলতাম, কোনো দেশ আমাদের আক্রমণ করলে আমরা জবাব দেব। আগে হামলার জবাবে পাল্টাহামলার নীতি অনুসরণ করেও শত্রুপক্ষের একের পর এক আক্রমণ ঠেকাতে পারেনি ইরান। এ বিশ্লেষকের মতে, ইরানের দীর্ঘ মেয়াদে লক্ষ্য হলো এমন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতের মার্কিন প্রশাসনগুলো ইরানে হামলার সাহস করার আগে দুবার ভাবে। ইরান এই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চাইছে উল্লেখ করে খুরি বলেন, ইরানিরা আসলে ঔপনিবেশিক যুগের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করছে।
মোহেবির ভাষ্যমতে, ২০২৫ সালের জুন মাসে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আগের চেয়ে দেড় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও মোট ক্ষেপণাস্ত্রের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা তিনি গোপন রেখেছেন, তবে দাবি করেছেন যে এসব অস্ত্রের মান, ধ্বংসক্ষমতা এবং লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এমনকি ইরান এখন ‘ফাদার অব অল বম্বস’ বা সব বোমার জনক নামের একটি নতুন বিধ্বংসী অস্ত্র প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও তিনি জানান। যুদ্ধের কারণে তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে এসেছিল। কারণ, রপ্তানিকারকেরা পাইপলাইনসহ বিকল্প পথ ব্যবহার করে তেল ও গ্যাস পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনাও নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার আইআরজিসির নৌবাহিনী জানায়, পারস্য উপসাগরের উত্তরাঞ্চলে চারটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে, যেগুলোর বিরুদ্ধে অবৈধভাবে তেল পরিবহনের অভিযোগ আনা হয়েছিল। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে আরও তিনটি জাহাজ সামুদ্রিক মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোর্তাজাভির মতে, ইরান ২০২৫ ও ২০২৬ সালের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা করছে।
তার ভাষায়, ইরান প্রচলিত শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ না হলেও অসমতাভিত্তিক কৌশল ব্যবহার করে ওয়াশিংটনের ওপর বড় ধরনের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে চায়।
এই চাপের প্রভাব আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালাবেন না।
মোর্তাজাভি মনে করেন, ভবিষ্যতে ইরানে হামলার ঝুঁকি নেওয়ার আগে মার্কিন প্রশাসনকে চড়া মূল্য দেওয়ার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। ভবিষ্যতে ইরানে যেকোনো হামলার জন্য হামলাকারীদের অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে।
এদিকে আরব সেন্টারের বিশ্লেষক রামি খুরি মনে করছেন, ইরানের এই নতুন কৌশলের লক্ষ্য হলো যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি নিজের ভূখণ্ডের বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া। তিনি আল-জাজিরাকে বলেছেন, সংঘাত কেবল ইরান, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর প্রভাব পড়ায় বিশ্বজুড়ে এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়বে। তিনি সংঘাতের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে বলেন, এর উদ্দেশ্য হতে পারে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা। মোর্তাজাভি বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁদের ধারণা, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন বার্তা দিচ্ছেন। গত বুধবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, খুব শিগগির কিছু একটা ঘটবে এবং তিনি একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে নজর রাখছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অবশ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। বিপরীতে তেহরান এনপিটি চুক্তির আওতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারের পক্ষে তাদের অবস্থান অটল রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, চলমান সংঘাত নিয়ে তিনি শিগগিরই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যে ভিন্ন ভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যে একটি নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প এ কথা বলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চলতি সপ্তাহে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন।
উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষিতে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে অবস্থানরত জরুরি দায়িত্বে নেই এমন কূটনৈতিক কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসও হামলার সতর্কবার্তা জারি করেছে। তবে মুখপাত্র টমি পিগট স্পষ্ট করেছেন যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের সব মার্কিন মিশনের জন্য এই নির্দেশ প্রযোজ্য নয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত রোববার ইরান সরকারের পরিবর্তনের বিষয়ে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের আগে তার এই বার্তা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সব মিলিয়ে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কূটনৈতিক পথ খোলা থাকলেও ইরান ও তার প্রতিপক্ষ দেশগুলোর মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের ইরান–সমর্থিত হুতি ও সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে।

















