মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সমীকরণে সৌদি আরবকে বাইরে রেখে তুরস্ক, পাকিস্তান, কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার সমন্বয়ে গঠিত ‘বদর প্রতিরক্ষা চুক্তি’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতে স্বনির্ভরতা অর্জন, আধুনিক প্রযুক্তির আদান-প্রদান এবং প্রচলিত রাজতান্ত্রিক বলয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সার্বভৌম নিরাপত্তা কাঠামো তৈরিতেই মূলত গুরুত্ব দিচ্ছে এই চার দেশ।
লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল স্টিফেনস মনে করেন, ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা কাঠামো ছিল মূলত সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি এবং ওয়াশিংটনের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। তবে বর্তমান পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো নিজেদের সামরিক শক্তিমত্তার ওপর দাঁড়িয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে আগ্রহী। এই জোটে কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার অংশগ্রহণ নির্দেশ করে যে, তারা এখন আর একক কোনো আঞ্চলিক শক্তির ছায়াতলে বন্দি থাকতে রাজি নয়।
তুরস্কের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চের প্রধান ড. এরদোগান কারাকুশ এই উদ্যোগকে আগ্রাসী কোনো পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন না। তার মতে, এই জোটের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ উৎপাদন ও কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা। সৌদি আরব যখন পশ্চিমা ব্লকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে, তখন আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা ও ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়নে মনোনিবেশ করছে। এর মূল মন্ত্র হলো—নিজেদের পায়ে দাঁড়ানো।
আটলান্টিক কাউন্সিলের অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা ইনিশিয়েটিভের ফেলো ড. সিনা আজিজি মন্তব্য করেন, সৌদি আরবকে এই চুক্তির বাইরে রাখার পেছনে মূলত আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও পররাষ্ট্রনীতির পার্থক্য কাজ করেছে। দোহা ও তুরস্কের নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি সব সময় রিয়াদের এজেন্ডার সঙ্গে মেলেনি। ফলে কাতার এখন তার নিরাপত্তার জন্য কেবল উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর নির্ভর করে বসে থাকতে নারাজ।
পাকিস্তানের সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক তালাত মাসুদ মনে করেন, তুরস্কের আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি, পাকিস্তানের পারমাণবিক অভিজ্ঞতা এবং কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার কৌশলগত শক্তি একত্রিত হলে তা যে কোনো আঞ্চলিক চাপ মোকাবিলার উপযোগী একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তুলবে। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত ক্ষমতার সমীকরণের বাইরে এটি এক নতুন শক্তির উত্থান।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, ‘বদর প্রতিরক্ষা চুক্তি’ কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ কোনো সামরিক সমঝোতা নয়। এটি বহুমাত্রিক ক্ষমতার যুগে একটি নতুন ভূকৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করবে, যা মুসলিম বিশ্বের সামগ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের একক প্রভাবকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে অবাধ জাহাজ চলাচল ও গাজায় যুদ্ধবিরতির মতো বিষয়গুলো নিয়েও এই দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত ঐকমত্য ও সমন্বয় থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

















