বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান দলীয়করণ এবং অব্যাহত রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজবাড়ী পৌরসভার রজনীগন্ধা মিলনায়তনে পাঁচ জেলার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার প্রাক্কালে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। তাদের বিরুদ্ধেও লড়াই অব্যাহত থাকবে। এসব বিষয় সংসদেও তুলে ধরা হচ্ছে বলে জানান তিনি। সাংবাদিকেরা তথ্য সংগ্রহ করে সংবাদ প্রকাশ করেছেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন যে শান্তিপূর্ণ হবে, এমনটা মনে করার যৌক্তিক কারণ নেই। গত কয়েক দিনে সরকারদলীয় অন্তঃকোন্দলের জেরে অসংখ্য মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে এনসিপি মনে করে, বর্তমান প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের দলীয় আচরণ সুষ্ঠু ভোটের পথে বড় অন্তরায়। এই সংকটের সমাধানে নির্বাচন কমিশনের কাছে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনা দেওয়া হবে এবং তার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী নির্বাচনের পরিবেশ যাচাই করা হবে। আজ বুধবার জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে একটি প্রতিনিধি দল গিয়েছে বলেও তিনি জানান। এই কয়েক দিনে সরকারদলীয় অন্তঃকোন্দলে কয়েকশ মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশনকে আমরা সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব দেব।
ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রসঙ্গ টেনে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পরাজয় ঘটলেও তাদের দোসররা এখনো বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় রয়েছে। তিনি ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজদের নতুন ও পুরনো শক্তির যোগসাজশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এদের হাত থেকে জনগণকে মুক্ত করাই এখন বড় লক্ষ্য। আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়েছে। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ একদিকে, স্বৈরাচার একদিকে, আরেক দিকে নতুন চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজ শক্তি—এরা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। বাংলাদেশের মানুষ ও ছাত্র-জনতা জীবন ও রক্ত দিয়ে ফ্যাসিবাদ উৎখাত করেছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সাংবাদিকদের নিয়ে করা আপত্তিকর মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন নাহিদ। তিনি বলেন, দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকে পুলিশের এমন মন্তব্য শোভন নয়। অপরাধীদের না খুঁজে সাংবাদিকদের দোষারোপ করা পুলিশের কাজ হতে পারে না। তথ্যে ভুল থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, কিন্তু পেশাদার সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করা অগ্রহণযোগ্য। নিজেদের দায় সাংবাদিকদের ওপর চাপানোর পরিবর্তে পুলিশের দায়িত্ব হলো অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা।
মাদক সিন্ডিকেট বিষয়ে তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া মাদকের বিস্তার সম্ভব নয়। আগে আওয়ামী লীগ এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করত, এখন বিএনপি তা করছে বলে তার দাবি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ এনে তিনি বলেন, সরকার গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের কোনো প্রস্তাবই বাস্তবায়ন করেনি। উল্টো সত্য প্রকাশকারী সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, যা খুবই উদ্বেগজনক। সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের পাশে রয়েছেন তারা।
দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে চরম অসন্তোষ জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সংস্কার দৃশ্যমান নয়। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে রাখার মতো আস্থা তারা হারিয়ে ফেলেছে। বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে অর্থনৈতিক সংস্কারের কোনো রূপরেখা ছিল না। এমনকি ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি। বরং সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে ঋণখেলাপিদের সংসদে নিয়ে আসার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ব্যাংকিং খাত কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থা এখনো ফিরে আসেনি। রাজনৈতিক সহযোগিতায় ঋণ নিয়ে অর্থ বিদেশে পাচারের প্রবণতা বন্ধ করতে না পারলে ব্যাংকিং খাতের সংকট কাটবে না।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে, এনসিপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আলাদা ও এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। যদিও ১১ দলীয় জোট জাতীয় নির্বাচন ও সংসদের কার্যক্রমে ঐক্যবদ্ধ, তবুও এনসিপির নিজস্ব নীতি-আদর্শ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম ভিন্ন। জাতীয় ইস্যুতে জোটগত কর্মসূচি থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করতেই তারা নির্বাচনে পৃথকভাবে অংশ নেবেন। ১১ দলীয় জোট জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠিত জোট এবং বর্তমানে সংসদে বিরোধী দলীয় জোট হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থে এবং সরকারের গণবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে তারা একসঙ্গে থাকতে পারেন।
প্রেস ব্রিফিং শেষে পাঁচ জেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এনসিপির শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারজিস আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আরিফুল ইসলাম আদীব, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হোসাইন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হাসিবুর রহমান অপু এবং সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক সাইয়েদ জামিলসহ জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।

















