আগামী ২৭ অক্টোবর প্রতিনিধি নির্বাচনে ভোট দেবেন ইসরাইলের নাগরিকরা। এই সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশটির ছাব্বিশতম পার্লামেন্ট বা নেসেটের ১২০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটিই দেশটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রথম নির্বাচন। ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভোট মূলত প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকা বা না-থাকার ওপর এক ধরনের গণভোটে রূপ নিতে যাচ্ছে। দেশের ভেতরের বিচারে এই নির্বাচনটি ইসরাইলের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। জনমত জরিপগুলোর তথ্য বলছে, প্রতিযোগিতাটি বেশ হাড্ডাহাড্ডি হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের আগেই প্রতিটি দল তাদের সম্ভাব্য সংসদ সদস্যদের একটি তালিকা তৈরি করে জমা দেয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলার পর একযোগে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়েছে ইসরাইল। তা সত্ত্বেও চলতি মেয়াদ শেষ করতে যাওয়া এই নেসেটটি ১৯৮৮ সালের পর প্রথম পার্লামেন্ট, যা তাদের চার বছরের পুরো মেয়াদ শেষ করতে পারছে।
গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও একটি পৃথক স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ইস্যুটি সাধারণ ইসরাইলি ভোটারদের কাছে খুব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে না। নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোসহ প্রায় সব প্রধান ইহুদি রাজনৈতিক দলই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। শুধুমাত্র সংখ্যালঘু আরব দলগুলোই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সমর্থনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সাধারণ ভোটাররা সরাসরি কোনো প্রার্থীকে ভোট দেন না, বরং পুরো দেশকে একটি একক নির্বাচনী এলাকা ধরে রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। পরবর্তীতে দলগুলো প্রাপ্ত মোট ভোটের শতাংশ অনুযায়ী পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব পায়। তবে কোনো দলকে নেসেটে আসন পেতে হলে অবশ্যই অন্তত ৩.২৫ শতাংশ ভোটের শর্ত পূরণ করতে হয়। আসন বণ্টনের জন্য ১৯৭৩ সালের ‘বাদর-ওফার’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যেখানে এই সীমার নিচে থাকা দলগুলোর ভোট গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে বাদ পড়ে যায়। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকরা নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে ভোট দেন না, তারা একটি রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। এই পরিমাণ ভোট পেলে তারা ন্যূনতম ৪টি আসন পাওয়ার যোগ্যতা লাভ করে। কোনো দল যদি ন্যূনতম ৩.২৫ শতাংশ ভোটের সীমা পার করে, তবেই সেই দলের মোট ভোট হিসাব করা হয়। এরপর একটি জটিল গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে সেই ভোটগুলো ভাগ করে দেওয়া হয়, যা ওই ৩.২৫ শতাংশের নিচে পড়া দলগুলোর ওপর থেকে চলে আসে। ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, এটি সবসময়ই কয়েকটি দলের একটি সম্মিলিত জোটে রূপ নেয়। দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তিটি যদি ২৮ দিনের মধ্যে সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হন, তবে প্রেসিডেন্ট অন্য কাউকে সেই সুযোগ দিতে পারেন কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব পার্লামেন্টের ওপর ছেড়ে দিতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সেনাবাহিনীতে যোগদানের আইন নিয়ে দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ইঙ্গিত দিয়েছে, আইজেনকোটের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে তারা তাতে বাধা দেবে না। নেসেটে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার মতো পরিষ্কার পথ এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের সামনেই নেই।
ইসরাইলে নতুন সরকার গঠন করতে হলে ছাব্বিশতম নেসেটের মোট ১২০টি আসনের মধ্যে অন্তত ৬১টি আসনে সমর্থন নিশ্চিত করতে হয়।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো দেখাচ্ছে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট এবং বিরোধীদের মধ্যবর্তী শিবিরের শক্তি প্রায় সমান-সমান।
এককভাবে কোনো দল ৬১টি আসন না পাওয়ায় নির্বাচন শেষে প্রেসিডেন্ট দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নেতাক সরকার গড়ার আহ্বান জানান। বহু দলের এই মেরুকরণে ছোট ছোট দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানই শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক ভূমিকা পালন করে।
নির্বাচনের দৌড়ে দুটি স্পষ্ট ব্লক গড়ে উঠেছে। নেতানিয়াহু শিবিরে রয়েছেন ওৎজমা ইয়েহুদিত দলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতমার বেন-জাভির, শাস দলের নেতা আরিয়েহ ডেরি এবং রিলিজিয়াস জায়োনিজম-জেহুত তালিকার অর্থ মন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ। তবে গাজায় যুদ্ধবিরতির মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে এই জোটের ভেতরে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন দেখা গেছে।
অপরদিকে, নেতানিয়াহু-বিরোধী পরিবর্তন শিবিরে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন ‘ইয়াসার!’ দলের গাদি আইজেনকোট। পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের দল এবং ইয়াইর লাপিদের ‘ইয়েশ আতিদ’ একত্রিত হয়ে গঠন করেছে ‘বিইচাদ’ জোট। এছাড়াও ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’ এই শিবিরের অন্যতম শরিক হিসেবে মাঠে রয়েছে। নেতানিয়াহু-বিরোধী জোট নিজেদের পরিবর্তনের স্বপক্ষের জোট বলে দাবি করছে। সেখানে তাদের কাজের মূল অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিরোধী শিবিরের নেতারা একটি যৌথ রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রে সই করেছেন। এতে ৭ অক্টোবরের সিকিউরিটি ব্যর্থতার তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন, আল্ট্রা-অর্থোডক্স যুবকদের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের বিধান করা এবং অর্থনৈতিক সংস্কার জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন কিংবা তারা আরব দলগুলোকে সাথে নিয়ে সরকার গড়বেন কি না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেনি বিরোধী জোট। ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য দায়ভার কার, আল্ট্রা-অর্থোডক্স বা গোঁড়া ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হবে কি না, জীবনযাত্রার খরচ কীভাবে কমবে, এবং বহির্বিশ্বে ইসরাইলের অবস্থান ও জাতীয় নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে তারা গভীরভাবে ভাবছেন। এসব বিষয়ের মধ্যে অন্যতম হলো সরকারে আরব দলগুলোকে নেওয়া হবে কি না। এর মধ্যে রয়েছে ৭ অক্টোবরের ঘটনার তদন্তে একটি কমিশন গঠন করা, আল্ট্রা-অর্থোডক্সদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ নিয়ে একমত হওয়া, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সময়সীমা নির্দিষ্ট করা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক সংবিধান তৈরি করা। তাই বাধ্য হয়েই তাকে উগ্র-ডানপন্থী দলগুলোকে সাথে নিয়ে জোট বাঁধতে হচ্ছে।
ইসরাইলের পররাষ্ট্রনীতির জায়গায় নির্বাচন ঘিরে বিশেষ কোনো বড় পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা সত্ত্বেও ইরান, লেবানন ও সিরিয়ার বিষয়ে ইসরাইল কঠোর সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখবে। তবে নতুন সরকার এলে তাদের প্রকাশভঙ্গিতে কেবল কিছুটা নমনীয়তা দেখা যেতে পারে। তবে সময়ের সঙ্গে এই জোটের ভেতরেও কিছুটা রদবদল হয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, জোট গঠনের এই গাণিতিক জটিলতা কাটাতে শেষ পর্যন্ত তিনটি প্রধান রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভর করতে হবে
- পালাক্রমে নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া
- আরব দলগুলোর সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করা, অথবা
- আল্ট্রা-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে হাত মেলানো।
এমনকি দীর্ঘস্থায়ী এই অচলাবস্থা কাটাতে আইজেনকোট ও নেতানিয়াহুর মধ্যে মেয়াদ ভাগ করে পালাক্রমের সরকার গঠনের মতো নতুন ফর্মুলাও সামনে আসতে পারে। রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে ভোটগ্রহণ শেষ হলেও খুব দ্রুত কোনো স্থায়ী জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। অনেকগুলো অমীমাংসিত বিষয় সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় নতুন জোট গড়ে তোলা বেশ কঠিন হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বেন-জাভিরের মতো জোট সঙ্গীদের রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতি নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে পুরোপুরি নাও মিলতে পারে।

















