সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের চলমান সংকট নিরসনে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বৈঠক ফলপ্রসূ হয়নি। প্রশাসনের দেওয়া বিভিন্ন আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতে না পেরে শিক্ষার্থীরা তাঁদের পূর্বঘোষিত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। গত সোমবার রাতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের এক মতবিনিময় সভায় এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে বিকেল সাড়ে চারটায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিল। বৈঠকে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ও জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা শেষে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কর্মকর্তারা সরাসরি ক্যাম্পাসে এসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং আন্দোলন প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। তবে প্রশাসনের দেওয়া আশ্বাস শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করতে পারেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবি ও প্রশাসনের আশ্বাস
২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে তিনটি বিভাগের পাঁচটি ব্যাচে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী আছেন। কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, কলেজকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে মুক্ত করে পুরো কার্যক্রম শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিতে হবে অথবা কলেজটিকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে। এই দাবিতে গত রোববার বেলা ১১টার দিকে প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে শিক্ষকদের অবরুদ্ধ করে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। সংকট নিরসনে সিটি প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে কলেজকে মুক্ত করার উদ্যোগ এবং বিজ্ঞানাগার ও খেলার মাঠের সংকটও দূর করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে মুক্তির দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ১৪ শিক্ষক অবরুদ্ধ।
অধ্যক্ষের বদলির প্রজ্ঞাপন নিয়ে জটিলতা
সিটি প্রশাসকের বক্তব্য চলাকালে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নতুন দাবি তোলেন। তাঁরা কলেজের অধ্যক্ষ পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. আসাদুজ্জামানের বদলির প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবি জানান। জবাবে সিটি প্রশাসক এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান দিতে পারবেন না বলে শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন। তবে তিনি বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করার আশ্বাস দেন। এই বিষয়ে তাৎক্ষণিক ও সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা না আসায় শিক্ষার্থীরা হতাশ হন। এর ফলে কোনো ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে সিটি প্রশাসক ও জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। এরপর কলেজের তিনটি বিভাগের সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে এক জরুরি মতবিনিময় সভায় বসেন এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ দশা ও বর্তমান পরিস্থিতি
এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে প্রশাসনিক ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ হওয়া কলেজের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আংশিক মুক্তি দেওয়া হয়েছে। গত সোমবার রাত ১০টার দিকে ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ থাকা ২০ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে মুক্ত করে দেন শিক্ষার্থীরা। এর ফলে দীর্ঘ ৩৫ ঘণ্টা পর তাঁরা অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্তি পেলেন। তবে তাঁরা ক্যাম্পাস ছেড়ে বাইরে যেতে পারছেন না। কারণ ক্যাম্পাসের মূল ফটকসহ সব জায়গায় শিক্ষার্থীরা তালা ঝুলিয়ে রেখেছেন। গত দুই দিনের ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবারও ক্যাম্পাসের ফটকসহ বিভিন্ন একাডেমিক ভবনে তালা ঝুলতে দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে টানা ২৪ ঘণ্টা অবরুদ্ধ অধ্যক্ষ–শিক্ষক, জানালা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে খাবার।
প্রশাসনের বক্তব্য ও অচলাবস্থা
সার্বিক বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরাও আমাদের কথায় আশ্বস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু যখন আমরা সরাসরি ক্যাম্পাসে গেলাম, তখন কিছু শিক্ষার্থী আন্দোলন থেকে সরে যেতে রাজি হলেও, অনেকে আবার এর বিরোধিতা করেন। আমরা আন্তরিকভাবে চাই শিক্ষার্থীরা আন্দোলন পরিহার করে দ্রুত ক্লাসরুমে ফিরে যাক।’ অন্যদিকে কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা মো. আসাদুজ্জামান জানান, শিক্ষার্থীরা ফটকসহ বিভিন্ন জায়গায় তালা ঝুলিয়ে রাখায় গতকাল থেকে কেউ ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে পারছেন না। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে কোনো কার্যকর সমাধান না আসায় ক্যাম্পাসের অচলাবস্থা এখনো অব্যাহত রয়েছে।













