গাজা উপত্যকাজুড়ে জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টনে পৌঁছেছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধে যে পরিমাণ ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছিল, গাজার বর্তমান পরিস্থিতি তার তুলনায় প্রায় ২০ গুণ বেশি। সংস্থাটির ফিলিস্তিন বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জ্যাকো সিলিয়ার্স জানিয়েছেন, এই বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ অপসারণ আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় এবং জটিল একটি অভিযান হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের প্রাক্কলন বলছে, এই ধ্বংসস্তূপ পুরোপুরি সরিয়ে ফেলতে অন্তত সাত থেকে ১০ বছর সময় প্রয়োজন এবং এর জন্য শত শত কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে।
গাজা সিটির তেল আল-হাওয়া এলাকার বৈরুত স্ট্রিট বর্তমান পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরে। এক সময়ের ব্যস্ত এই এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রকৌশলী আহমেদ আলিয়ান জানান, ধ্বংসস্তূপের এই বিশাল পাহাড় দেখে মনে হয়, হাতের চামচ দিয়ে সমুদ্র সেঁচে ফেলার মতো অসাধ্য সাধনের চেষ্টা চলছে। গাজার মাত্র ৩০ শতাংশ এলাকায় বর্তমানে ত্রাণকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার রয়েছে, যা এই কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলেছে। একসময় দোকানপাট, অফিস ও মানুষের ব্যস্ততায় সরগরম থাকা সড়কটি এখন প্রায় জনশূন্য।
গত দুই বছরে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয়ে গাজার প্রায় ৫৮০ কিলোমিটার রাস্তা পরিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৯ লাখ ৭ হাজার টন ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে, যার মধ্যে ৩ লাখ টনের বেশি অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য হিসেবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে। তবে গাজার মোট ধ্বংসস্তূপের তুলনায় এটি মাত্র দেড় শতাংশ। ভারী যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রীর অভাব এই কার্যক্রমের বড় বাধা। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে অনেক সরঞ্জামকে ‘দ্বৈত ব্যবহারের’ সামগ্রী হিসেবে চিহ্নিত করে গাজায় প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ফলে পুরনো যন্ত্র মেরামত করেই কাজ চালাতে হচ্ছে প্রকৌশলীদের। গত দুই বছরের বেশি সময়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গাজার প্রায় ৫৮০ কিলোমিটার সড়ক পরিষ্কার করেছে। পাশাপাশি যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হামলা ও নতুন করে ধ্বংসের ঘটনা ঘটায় কিছু সড়ক একাধিকবার পরিষ্কার করতে হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির সময় নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ ঘিরে প্রবেশাধিকারও সীমিত রয়েছে।
ধ্বংসস্তূপ পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্যে ইউএনডিপি পাঁচটি কেন্দ্র পরিচালনা করছে। তবে যন্ত্রাংশ ও তেলের সংকটে প্রায়ই কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রকৌশলী নেহাল আবু হাসান জানিয়েছেন, পুনর্ব্যবহৃত কংক্রিটের মান কম হলেও রাস্তা মেরামত ও গর্ত ভরাট করতে এটিই এখন একমাত্র ভরসা। ইব্রাহিম দারাদোনার মতো বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিরা জানান, ধ্বংসাবশেষ সরানোর ফলে ইঁদুর ও পোকামাকড়ের উপদ্রব কমায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে এবং দোকানপাটের সামনে পথ পরিষ্কার হওয়ায় ছোট পরিসরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে। ভবনটির ভেতরেই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন কয়েকটি বাস্তুচ্যুত পরিবার।
তবে এই ধ্বংসস্তূপের নিচে লুকিয়ে আছে মানবিক এক ট্র্যাজেডি। জাতিসংঘের হিসাবে, এখনো ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষের মরদেহ ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধার, ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তকরণ এবং শেষ পর্যন্ত তাদের ধর্মীয় মর্যাদায় দাফন নিশ্চিত করা উদ্ধারকারী দলগুলোর জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল কাজ। এ কাজে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় করা হচ্ছে। রাস্তার পাশে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বহুতল ভবন কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে কোথাও কোথাও রাস্তার ওপর দিয়ে নোংরা পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
উদ্ধারকাজের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা অবিস্ফোরিত বিস্ফোরক এবং আংশিক ধসে পড়া ভবন। ব্রিটিশ সংস্থা হ্যালো ট্রাস্ট এবং জাতিসংঘের মাইন অ্যাকশন সার্ভিস ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে কাজ করলেও সম্পদের সীমাবদ্ধতায় পুরো প্রক্রিয়াটি ধীরগতিতে চলছে। অ্যাসবেস্টসের মতো ক্ষতিকারক উপাদানের উপস্থিতিও উদ্ধারকর্মীদের জন্য বাড়তি ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘের মতে, গাজায় ধ্বংসস্তূপ সরানোর বিষয়টি কেবল পুনর্গঠনের শর্ত নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও সেবা পুনরায় চালুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। উদ্ধার অভিযানটি ধীর হলেও এর প্রতিটি পদক্ষেপ গাজার ভেঙে পড়া জনজীবনকে স্বাভাবিক করার পথে একটি অপরিহার্য ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

















