ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সি সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো যুদ্ধের ময়দানে দীর্ঘ আট মাসেরও বেশি সময় ধ্বংসস্তূপের নিচে বন্দি থেকে শেষ পর্যন্ত একটি বিশালাকার ড্রোনের সহায়তায় প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন। চারপাশে শত্রুর ড্রোন, উদ্ধারে গেলেই মৃত্যুর ঝুঁকি—এমন পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সি সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো। ভ্লাসেনকো বলেন, ‘তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, এটাই সম্ভবত সবকিছু বদলে দেওয়ার মুহূর্ত। হাড়ও ক্রমেই আরও বেশি বেরিয়ে আসছিল।’।
এই অবিশ্বাস্য উদ্ধার অভিযানটি গত ৪ অক্টোবর সম্পন্ন হয়েছে।
ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, পাঁচ বছর ধরে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আকাশপথে ড্রোনের সাহায্যে কোনো সেনাকে উদ্ধারের এটিই প্রথম ঘটনা। এখান থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।’। তার ভাষায়, ‘তখন আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট ছিল না।’।
খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভ্লাসেনকো নিজের বেঁচে ফেরার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের একটি হাসপাতালে শুয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান ভ্লাসেনকো।
ভ্লাসেনকো ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য হিসেবে গত বছরের মে মাসে খারকিভের সম্মুখসারিতে দায়িত্ব পালন করতে যান।
সেখানে তার সঙ্গী ছিলেন ‘বাসকি’ সাংকেতিক নামের আরেক সেনাসদস্য।
তারা একটি ছোট মাটির বাংকারে থাকতেন, যেখানে ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হতো। তবে সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার এক প্রচেষ্টায় বিপর্যয় নেমে আসে। ভ্লাসেনকোর ভাষ্যমতে, তাকে প্রতিস্থাপন করতে যাওয়া দুই সেনা এবং পরে তাদের মরদেহ উদ্ধারে যাওয়া আরও দুই সেনা অভিযানে নিহত হন। তার দুই পায়ের কাটা অংশ তখনও ব্যান্ডেজে মোড়ানো। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে চকলেট ও দামি সিগারেটও পাঠানো হয়েছিল। দীর্ঘদিন সম্মুখসারিতে থাকার কারণে ভ্লাসেনকোর ওজন কমে আনুমানিক ৭০ কেজিতে নেমে এসেছিল বলে ধারণা করেছিলেন কর্মকর্তারা। অক্টোবরের শুরুর দিকে ভ্লাসেনকোর কাছে নিয়মিত সরবরাহের প্যাকেটের সঙ্গে পৌঁছায় একটি বিশেষ নিরাপত্তা বেল্ট বা হারনেস এবং নির্দেশনামূলক ভিডিওসহ একটি ফোন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে বাংকারে পানি ঢুকে পড়লে তারা কাছের একটি বিধ্বস্ত স্কুল ভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সেখানে শুকনো পোশাক ও খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে একটি রুশ নজরদারি ড্রোনের নজরে পড়ে যান তারা। পরবর্তী রুশ ড্রোন হামলায় বাসকি নিহত হন এবং ভ্লাসেনকো গুরুতর আহত হন। বিস্ফোরণে তার বাঁ পায়ের পাতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং ডান পা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ১০ মাস একসঙ্গে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তাদের বাংকারে পানি ঢুকে পড়ে।
চলাচলের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা ভ্লাসেনকো স্কুলের পুরোনো বয়লারের নিচে থাকা প্রায় ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার আয়তনের ছোট্ট একটি গর্তে আশ্রয় নেন। একপর্যায়ে ক্ষতবিক্ষত ডান পায়ের যন্ত্রণা সইতে না পেরে তিনি নিজেই ছুরি দিয়ে সেটি কেটে ফেলেন এবং রক্তপাত রোধে টুর্নিকেট ব্যবহার করেন। দীর্ঘ আট মাস ধরে তিনি সেই গর্তে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে বেঁচে ছিলেন। তার মোট ফ্রন্টলাইন অভিজ্ঞতার সময় ছিল ৪৯১ দিন। ড্রোন হামলায় এক পা উড়ে গেছে, অন্য পাটিও বাঁচাতে নিজেই ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে আগেই মৃত ভেবে নিয়েছিলাম।
সেই এলাকাটি ‘কিল জোন’ হিসেবে পরিচিত ছিল, যেখানে শত্রুর অসংখ্য ড্রোনের টহলের কারণে উদ্ধার অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এর আগে দুটি স্থলভিত্তিক চালকবিহীন যান ব্যবহার করে ভ্লাসেনকোকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হলেও সেগুলো রুশ হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের স্থানীয় প্রতিষ্ঠান গুরজুফ ডিফেন্সের তৈরি একটি ছয় প্রপেলারের ভারী ড্রোন ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই বিশেষ ড্রোনটি ৯০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করতে সক্ষম। এটি সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে। কারণ, আকাশজুড়ে অসংখ্য ড্রোন টহল দেওয়ায় সেখানে সামান্য নড়াচড়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
উদ্ধার অভিযানের জন্য ৪ অক্টোবর ভারী ড্রোনটির সঙ্গে তিনটি ছোট ড্রোন পাঠানো হয়, যাদের কাজ ছিল রুশ আক্রমণ প্রতিহত করা। এর পাশাপাশি চারটি ইউক্রেনীয় এফপিভি ড্রোন ও কামানের সাহায্যে শত্রুর অবস্থানে দুই ঘণ্টা ধরে হামলা চালানো হয়, যেন উদ্ধারপথ নিরাপদ থাকে। এরপর বিশেষ নিরাপত্তা বেল্টের মাধ্যমে ভ্লাসেনকোকে ড্রোনের সাথে যুক্ত করে মাটি থেকে ৭০ মিটার উচ্চতায় তুলে নেওয়া হয়। এরপর ড্রোনটি তাকে প্রায় ৭০ মিটার বা ২৩০ ফুট উচ্চতায় তুলে নেয়। ড্রোনটির ছয়টি উল্লম্ব রোটর এবং কালো কাঠামো দেখতে বিশাল কোনো পোকামাকড়ের মতো। এসব ড্রোনের সাহায্যে দূর থেকে বসেই সরাসরি দৃশ্য দেখে আক্রমণ চালাতে পারেন চালকেরা। এগুলোর কাজ ছিল রুশ আক্রমণকারী ড্রোনগুলোকে বিভ্রান্ত করা।
প্রায় ১৫ মিনিটের উড়ান শেষে ভ্লাসেনকোকে ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। ভ্লাসেনকো জানান, এত বিপদের মধ্যেও আকাশে ওড়ার সময় তার মনে শুধু একটিই ভয় ছিল—পানিতে পড়ে যাওয়া, কারণ তিনি সাঁতার জানতেন না। বনের মধ্যে পড়ার ভয় তার ছিল না। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং তার অভিজ্ঞতার বিবরণ সামরিক বাহিনী ও উদ্ধারকারী ড্রোনের ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিওর সাথে মিলে যায়। সব শঙ্কা কাটিয়ে প্রায় ১৫ মিনিটের উড়ান শেষে ভ্লাসেনকোকে বহনকারী ড্রোনটি নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছায়।

















