গ্রাম-বাংলার লোকসমাজে শকুনকে ঘিরে একসময় নানা রূপকথা ও অন্ধবিশ্বাস প্রচলিত ছিল। প্রবীণদের অনেকে মনে করতেন, কোনো বাড়ির ওপর দিয়ে শকুন উড়ে গেলে তা অশুভ সংকেত বহন করে। সে সময় গোয়াল ঘরে ধোঁয়া দিয়ে গরু রক্ষা করার অদ্ভুত রেওয়াজও ছিল। তবে কালের বিবর্তনে সেই বিশ্বাস এখন ফিকে হয়ে এসেছে এবং একইসঙ্গে প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে শকুন। গ্রাম-বাংলার প্রতিটি আনাচে-কানাচে লুকিয়ে আছে রূপকথার গল্প। যার কিছুটা সত্যি হলেও অধিকাংশই ছিল কাল্পনিক। যদিও প্রবীণরা এর উপর বিশ্বাস রেখে তাদের জীবন পরিচালনা করত। আলোচিত এই পাখি যখন কোনো বাড়ির উপর দিয়ে অতিক্রম করত তখন দাদি-নানিরা বলত, ‘এই গেদি মরার হগুন উড়ত্যাছে-গোয়াল ঘরে ধুমা দে (শকুন উড়ছে, গোয়াল ঘরে ধোঁয়া দাও)। তাদের কথা তামিল করতে বউ-ছেলে-মেয়েরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠত। গোয়ালের গরু রক্ষায় তারা মাটির পাত্রে তুষের আগুন জ্বালিয়ে গোয়াল ঘরে ধোঁয়া দিত। এদের মাথা, গলা ও ঘাড়ে কোনো পালক নেই। এরা প্রশস্ত ডানায় ভর করে উড়ে বেড়ায় আকাশের অনেক উপরে।
কামারখন্দ উপজেলার ১০৪ বছর বয়সী প্রবীণ বাসিন্দা জসিম উদ্দিন জানান, শকুন সাধারণত অসুস্থ বা মুমূর্ষু প্রাণীর ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখে। প্রাণীটি মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করে। এরা সাধারণত আকাশে চক্রাকারে ওড়ে এবং বায়ুপ্রবাহের ওপর নির্ভর করে চলাচল করে। মূলত বট, পাকুড় ও ডুমুরজাতীয় বড় গাছে এরা আস্তানা তৈরি করে। প্রজনন ঋতুতে এরা গুহা বা গাছের কোটরে এক থেকে তিনটি সাদা বা ফ্যাকাসে রঙের ডিম পাড়ে। কামারখন্দ উপজেলা বয়োবৃদ্ধ জসিম উদ্দিন (১০৪) জানায়, এরা অসুস্থ আর মৃতপ্রায় প্রাণীর চারিদিকে শিকারী পাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে প্রাণিটি মরার পর্যন্ত অপেক্ষা করে। গুহা, পর্বতের চূড়া বা গাছের কোটরে এরা ১ থেকে ৩টি সাদা বা ফ্যাকাসে ডিম পাড়ে। দেখতে খুব সুন্দর- ব্যাপারটা ওরকম নয়। চক্রাকারে ঘোরা এই পাখির কোনোটিকে মাটিতে নামতে দেখলে অন্যগুলো তাকে অনুসরণ করে হামলে পড়ত।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আনোয়ারুল হকের দেওয়া তথ্যমতে, বিশ্বে ১৮ প্রজাতির শকুনের অস্তিত্ব থাকলেও বাংলাদেশে বর্তমানে মাত্র পাঁচ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। এদের মধ্যে বাংলা শকুন, সরুঠোঁট শকুন, রাজ শকুন, কালো শকুন ও হিমালয়ান শকুন উল্লেখযোগ্য। এছাড়া হিমালয়ান ও ইউরেশীয় প্রজাতির শকুন অতিথি পাখি হিসেবে আমাদের দেশে আসে। তার মধ্যে বাংলাদেশে এখন প্রায় ৫ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। ২ প্রজাতির অতিথি পাখি হিসেবে আমাদের দেশে আসে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় শকুনের ভূমিকা অতুলনীয়। শকুন একমাত্র প্রাণী যারা রোগাক্রান্ত মৃত পশুর মাংস খেয়ে হজম করতে সক্ষম। গবেষক ড. লিন্ডসের মতে, অ্যানথ্রাক্স, যক্ষ্মা ও খুরারোগের জীবাণু ছড়ানোর আগেই মৃতদেহ খেয়ে এরা প্রকৃতিকে পরিচ্ছন্ন রাখে। তবে বাংলাদেশে পশুখাদ্যে ডাইক্লোফেনাকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে এই উপকারী পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
অতীতে দেশের আনাচে-কানাচে প্রচুর শকুন দেখা গেলেও বর্তমানে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে তারা। শকুনের ওপর ঢিল ছোঁড়া, দড়ির ফাঁদ পাতা বা পিটিয়ে হত্যার মতো অমানবিক ঘটনা আজও ঘটে। পরিবেশ রক্ষায় শকুন টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক মহলে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস পালন করা হয়।

















