অভাবের কষাঘাতে জর্জরিত পরিবার, তবুও হার মানেনি অদম্য চার শিক্ষার্থী। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখেছে তারা। তবে অভাবী সংসারে বেড়ে ওঠা এই মেধাবীদের চোখে এখন আনন্দ ছাপিয়ে উদ্বেগের কালো মেঘ। উচ্চশিক্ষার সিঁড়িতে পা রাখার আগেই তাদের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে পড়াশোনার বাড়তি খরচ।
ফরিদপুর শহরের জোহরা বেগম উচ্চবিদ্যালয়ের একমাত্র জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী সাদিকা আক্তার। তার চিকিৎসক হওয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও বাস্তবতার চাপে স্বপ্নটি ফিকে হয়ে আসছে। পাঁচ বছর আগে মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদের পর থেকে মা মোহসিনা বেগম দুই মেয়েকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। সাদিকার ভাষায়, সংসারের অভাব বুঝতে পেরে চিকিৎসক হওয়ার পরিবর্তে এখন মানবিক বিভাগে পড়াশোনার চিন্তা করছে সে। তার মা মোহসিনা আক্তার জানান, মেয়ের স্বপ্ন পূরণের সাধ্য তার নেই, যা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ওয়াহিদা খানম মেধাবী সাদিকার পড়াশোনা যেন থমকে না যায়, সে বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
রাজবাড়ীর সানজিনা ইসলামের গল্পটাও ভিন্ন নয়। ইউটিউবে ফ্রি ক্লাস করে এবং শিক্ষকের সহায়তায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। তার বাবা রফিকুল ইসলাম ধারদেনা করে সৌদি আরবে পাড়ি জমালেও এখনো কর্মসংস্থান হয়নি। মা কুলসুম আক্তার জানান, পাওনাদারের চাপ আর সংসারের টানাটানির মধ্যে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সানজিনা এখন গোয়ালন্দ সরকারি কামরুল ইসলাম কলেজে ভর্তির স্বপ্ন দেখলেও অর্থাভাব তাকে তাড়া করে ফিরছে।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার তবারিপাড়া গ্রামের রুবাইয়া খাতুন রাকার অবস্থাও একই। কৃষক বাবার সামান্য জমির আয়ে ছয়জনের সংসার চলে। ধানগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া রুবাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়, কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকের খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন তার বাবা রাসেল হোসেন সরকার। প্রধান শিক্ষক সোনাতন কুমার বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এই অদম্য মেধাবীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য।
শেরপুরের সুমাইয়া আক্তার সুমীর বাবা তোফাজ্জল হোসেন ছিলেন পল্লী চিকিৎসক, যিনি অসুস্থ অবস্থায় মারা যাওয়ার আগে সন্তানদের চিকিৎসক বানানোর স্বপ্ন দেখতেন। ছয় শতাংশ জমি ছাড়া সম্বলহীন মায়ের পক্ষে সংসার চালানোই যখন দুরূহ, তখন সুমাইয়ার উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখাটাই বিলাসিতা মনে হচ্ছে। হালগড়া ফটিয়ামারী উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক এ এইচ মুরাদ জানান, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সুমাইয়া ও তার ভাই-বোনেরা টিকে আছে, তবে অর্থের অভাবে তার উচ্চশিক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এই চার শিক্ষার্থীর গল্প কেবল ব্যক্তিগত সংকটের নয়, এটি তাদের পরিবারের অদম্য জেদ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সংগ্রামের চিত্র। ভালো ফলাফল তাদের সাফল্যের পথ দেখালেও, অর্থের সীমাবদ্ধতা এখন সবচেয়ে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষক ও পরিবার এখন কেবল অপেক্ষার প্রহর গুনছে, কেউ হয়তো সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে তাদের স্বপ্ন পূরণে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারও বাবা নেই, কারও বাবা প্রবাসে গিয়েও কাজ পাননি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তার স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার; কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হতে হলে প্রচুর খরচ, এ খরচ বহন করার ক্ষমতা তার মায়ের নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তারপর থেকে সাদিকা ও আনিশা দুই মেয়েকে কোলেপিঠে করে গড়ে তোলার সংগ্রামে নামেন মা মোহসিনা বেগম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আমি জানি, কত অভাব– অনটনের মধ্যে আমাদের চলতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ জন্য রাত–দিন পরিশ্রম করে সে জিপিএ–৫ পেয়েছে; কিন্তু আর্থিক অনটনের কারণে আমার পক্ষে এ ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জোহরা বেগম উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ওয়াহিদা খানম বলেন, ‘চলতি বছর এ বিদ্যালয় থেকে সে–ই একমাত্র ছাত্রী, যে জিপিএ–৫ পেয়েছে; কিন্তু আর্থিক কারণে যদি আগামীতে তার পড়াশোনা ব্যাহত হয়, তবে একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন অভিভাবক হিসেবে এ দায় আমরা এড়াতে পারব।













