বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর, সাম্য ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা উচ্চারিত হয়েছে, তেমনি ফুটে উঠেছে প্রেম, সাম্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তবে নজরুলের জীবন ও সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিঝরা অঞ্চল মাদারীপুরের সম্পর্কও ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) তৎকালীন বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী ফকির আহমেদ ও জাহেদা খাতুনের পরিবারে জন্ম নেন কাজী নজরুল ইসলাম। চার পুত্রের মৃত্যুর পর জন্ম নেওয়া শিশুটির ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। শৈশব থেকেই দারিদ্র্য ও সংগ্রামকে সঙ্গী করে বেড়ে ওঠেন তিনি। মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর জীবনের নানা কঠিন অভিজ্ঞতা তাঁকে গড়ে তোলে।
লেটো দলে গান ও অভিনয়, রুটির দোকানে কাজ, রেলওয়ের খানসামার দায়িত্ব এবং পরবর্তী সময়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যোগদান—নজরুলের জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই ছিল সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিকতা। সাংবাদিকতা, সাহিত্যচর্চা, রাজনীতি ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার অন্যতম শক্তিশালী প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।
মাদারীপুর: বিপ্লব ও প্রতিরোধের ঐতিহাসিক ভূমি
শাহ মাদারের পুণ্যভূমি ও মহাকবি আলাওলের জন্মভূমির সঙ্গে পরিচিত মাদারীপুর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসেও বিশেষ মর্যাদা বহন করে। উনিশ শতকে হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে শুরু হওয়া ফরায়েজী আন্দোলন কৃষক ও প্রজাদের শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাঁর পুত্র দুদু মিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলন আরও প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ও সশস্ত্র প্রতিরোধের রূপ নেয়।
পরবর্তী সময়ে ১৯১০ সালে বিপ্লবী পূর্ণচন্দ্র দাসের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘মাদারীপুর সমিতি’। সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত তরুণদের নিয়ে গঠিত হয় ‘শান্তিসেনা’ বাহিনী। ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ডে এই সংগঠনের ভূমিকা মাদারীপুরকে বিপ্লবীদের কাছে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়।
১৯১৫ সালে বাঘা যতীনের নেতৃত্বে বুড়িবালামের তীরে সংঘটিত ঐতিহাসিক যুদ্ধে অংশ নেওয়া বিপ্লবীদের মধ্যে মাদারীপুরের কয়েকজন তরুণও ছিলেন। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণসহ পরবর্তী বিপ্লবী কর্মকাণ্ডেও এই অঞ্চলের বিপ্লবীদের অংশগ্রহণের ইতিহাস রয়েছে। তাঁদের আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার কারণে মাদারীপুরকে বিপ্লবীরা ‘চিতোর অব বেঙ্গল’ নামে অভিহিত করতেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
নজরুলের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ
কৈশোরে কাজী বজলে করিমের সান্নিধ্যে নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতচর্চার সূচনা হয়। পরবর্তীতে শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলে পড়ার সময় শিক্ষক নিবারণচন্দ্র ঘটকের সংস্পর্শে তাঁর মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী চেতনা আরও গভীর হয়। সাহিত্য ও কবিতাকে তিনি পরাধীনতার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন।
১৯২০ সালের ১২ জুলাই কাজী নজরুল ইসলাম ও কমরেড মুজফ্ফর আহমদের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় দৈনিক ‘নবযুগ’। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও বিস্তৃত হতে থাকে।
১৯২২ সালে প্রকাশ করেন অর্ধসাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’। ওই পত্রিকায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা প্রকাশের জেরে ব্রিটিশ সরকার তাঁর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের মামলা করে। ২৩ নভেম্বর ১৯২২ সালে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তী সময়ে আদালতে দেওয়া তাঁর ঐতিহাসিক বক্তব্য ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
কারাবন্দি অবস্থায় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন কবি। হুগলী জেলে বন্দিদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে তিনি দীর্ঘ অনশন করেন। তাঁর এই প্রতিবাদে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বিভিন্ন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করে।
বহরমপুর জেলে পূর্ণচন্দ্র দাসের সঙ্গে নজরুলের ঘনিষ্ঠতা
১৯২৩ সালের ১৮ জুন নজরুলকে বহরমপুর জেলে পাঠানো হয়। সেখানেই মাদারীপুরের বিপ্লবী নেতা পূর্ণচন্দ্র দাসসহ কয়েকজন বিপ্লবীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।
পূর্ণচন্দ্র দাসের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক ছিল গভীর শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব ও রাজনৈতিক সহমর্মিতার। কারাবন্দি অবস্থায় তাঁদের মধ্যে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ও সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টার বিষয়ে আলোচনা হতো। পূর্ণচন্দ্র দাসের উদ্যোগে বাইরে একটি চারণদল গঠনের পরিকল্পনা করা হয়, যার জন্য নজরুল নাটক রচনায় আগ্রহী হন।
মুজফ্ফর আহমদের স্মৃতিকথা এবং নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তীর জেল-ডায়েরিতে এ পরিকল্পনার উল্লেখ পাওয়া যায়। নজরুলের লেখা সেই নাটকের পাণ্ডুলিপি পরবর্তী সময়ে হারিয়ে গেলেও নাটকের একটি গান ইতিহাসে টিকে থাকে—‘জাতের নামে বজ্জাতি’।
গানটি ১৯২৩ সালের ২০ জুলাই ‘বিজলী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পাদটীকায় উল্লেখ ছিল, এটি মাদারীপুর শান্তিসেনা চারণদলের জন্য রচিত অপ্রকাশিত নাটক থেকে নেওয়া। গানটি পরে নজরুলের ‘বিষের বাঁশী’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়।
পূর্ণচন্দ্র দাসকে উৎসর্গ করা ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’
১৯২৩ সালের অক্টোবরে পূর্ণচন্দ্র দাস কারাগার থেকে মুক্তি পেলে তাঁকে সংবর্ধনা জানাতে নজরুল রচনা করেন ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কবিতা ও গান। বহরমপুর জেলে বসে লেখা এই কবিতা পাউরুটির ভেতরে লুকিয়ে বাইরে পাঠানো হয়েছিল বলে স্মৃতিকথায় উল্লেখ রয়েছে।
কবিতায় নজরুল পূর্ণচন্দ্র দাসকে সম্বোধন করেন—
‘স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারীপুরের মর্দবীর,
বাংলা-মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!’
এই রচনার মধ্য দিয়ে মাদারীপুরের বিপ্লবী নেতৃত্বের প্রতি কবির শ্রদ্ধা ও আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গবেষকদের একটি অংশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের ঐতিহাসিক উৎস হিসেবে এই কবিতার উল্লেখ করেন।
ফরিদপুর সম্মেলনে নজরুল ও মাদারীপুরের বিপ্লবীরা
১৯২৫ সালের ১ মে ফরিদপুরের টেপাখোলা মাঠে বেঙ্গল প্রোভিন্সিয়াল কংগ্রেস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সভাপতিত্বে আয়োজিত সম্মেলনে মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, সরোজিনী নাইডু ও মওলানা আবুল কালাম আজাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন।
মাদারীপুরের শান্তিসেনা বাহিনীও পূর্ণচন্দ্র দাসের নেতৃত্বে সম্মেলনে অংশ নেয়। সেখানে নজরুল ‘চরকার গান’, ‘শিকল-পরা ছল’ ও ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ পরিবেশন করেন।
বিপ্লবী তরুণ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, জীবন মোল্লা ও অন্যান্য কর্মীর সঙ্গে কবির পরিচয় ও যোগাযোগ তৈরি হয়। গবেষণা ও স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে, নজরুল তরুণ বিপ্লবীদের সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন।
১৯২৬ সালে মাদারীপুরে নজরুলের ঐতিহাসিক সফর
১৯২৬ সালের মার্চ মাসে মাদারীপুরে নজরুলের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি স্থানীয় ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ১১ ও ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত ‘নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মিলন’-এর তৃতীয় অধিবেশনে যোগ দিতে তিনি ১০ মার্চ সন্ধ্যায় স্টিমারযোগে মাদারীপুরে আসেন।
সভাপতি হেমন্তকুমার সরকার এবং বিপ্লবী দম্পতি বসন্তকুমার ও হেমপ্রভা মজুমদারের সঙ্গে কবি এই সফরে ছিলেন। সমকালীন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁকে স্বাগত জানাতে মাদারীপুর স্টিমার ঘাটে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ উপস্থিত হয়েছিল।
সম্মেলন উপলক্ষে কবি রচনা করেন ‘জেলেদের গান’, যা পরবর্তী সময়ে ‘ধীবরদের গান’ নামে তাঁর ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১১ মার্চ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নজরুল নিজ কণ্ঠে গানটি পরিবেশন করেন বলে ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এই সফরকালে কবি ১০ থেকে ১৩ মার্চ পর্যন্ত মাদারীপুরে অবস্থান করেন। সম্মেলনের অভিজ্ঞতা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক আবহ তাঁর সাহিত্যিক ও সামাজিক ভাবনায় বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল বলে গবেষণায় আলোচনা করা হয়।
‘হেমপ্রভা’ কবিতার সঙ্গে মাদারীপুরের যোগ
মাদারীপুর সফরের শেষদিকে, ১৩ মার্চ ১৯২৬ সালে নজরুল বিপ্লবী নেত্রী হেমপ্রভা মজুমদারকে নিয়ে ‘হেমপ্রভা’ কবিতা রচনা করেন। কবিতাটি পরবর্তীতে ‘ফণি-মনসা’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হয়।
মুদ্রিত কবিতার পাদটীকায় ‘মাদারীপুর, ২৯শে ফাল্গুন, ১৩৩২’ উল্লেখ থাকায় কবিতাটির সঙ্গে কবির মাদারীপুর অবস্থানের সরাসরি সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়।
নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও মাদারীপুরের পীর বাদশাহ মিয়ার সমর্থন
১৯২৬ সালের শেষদিকে কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে কংগ্রেস-সমর্থিত স্বরাজ পার্টির প্রার্থী হিসেবে ঢাকা বিভাগ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন নজরুল ইসলাম। ওই নির্বাচনী এলাকার মধ্যে তৎকালীন বৃহত্তর ঢাকা, ফরিদপুর-মাদারীপুর, বাকেরগঞ্জ ও ময়মনসিংহের অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মাদারীপুরের ফরায়েজী আন্দোলনের উত্তরসূরি পীর বাদশাহ মিয়া কবিকে সমর্থন জানিয়ে একটি ফতোয়া দিয়েছিলেন বলে জসীম উদ্দীনের স্মৃতিকথায় উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে নির্বাচনের ফলাফলে নজরুল জয়ী হতে পারেননি। ২৯ নভেম্বর প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, তিনি ১০৬২ ভোট পেয়ে পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন।
নির্বাচনে পরাজিত হলেও সাধারণ মানুষের অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে তাঁর এই প্রচেষ্টা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
‘সন্ধ্যা’ কাব্যগ্রন্থে মাদারীপুরের শান্তিসেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা
১৯২৯ সালের ১২ আগস্ট প্রকাশিত হয় কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ ‘সন্ধ্যা’। গ্রন্থটি তিনি মাদারীপুরের শান্তিসেনাদের উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। উৎসর্গপত্রে লেখা ছিল—
‘মাদারীপুর ‘শান্তি-সেনা’র কর-শতদলে ও বীর সেনানায়কের শ্রীচরণাম্বুজে।’
এই উৎসর্গ কবির সঙ্গে মাদারীপুরের বিপ্লবী আন্দোলনের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক দলিল। একই কাব্যগ্রন্থে সংকলিত রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় রণসংগীত ‘চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’।
নজরুলের কথাসাহিত্যে মাদারীপুরের প্রভাব
কাজী নজরুল ইসলামের কথাসাহিত্যেও মাদারীপুর অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশের উপস্থিতি দেখা যায়। ১৯৩০ সালের মে মাসে ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘জিনের বাদশা’ গল্পে আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরবর্তী একটি গ্রামের বর্ণনা রয়েছে।
গল্পের সূচনায় কবি লিখেছেন, ‘ফরিদপুর জেলায় ‘আরিয়ল খাঁ’ নদীর ধারে ছোট্ট গ্রাম। নাম মোহনপুর।’ এই বর্ণনা তাঁর সাহিত্যকর্মে এ অঞ্চলের প্রকৃতি ও জীবনযাত্রার প্রভাবের একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।
নজরুলের শেষ জীবন ও জাতীয় কবির মর্যাদা
১৯৪২ সালের ১০ অক্টোবর মাত্র ৪৩ বছর বয়সে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে নজরুল তাঁর বাকশক্তি ও বোধশক্তির বড় অংশ হারান। পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্য ও সংগীতকে ঘিরে দেশে নজরুলচর্চা অব্যাহত থাকে।
১৯৭২ সালের ২৪ মে স্বাধীন বাংলাদেশে কবিকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ও একুশে পদকে ভূষিত হন।
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট (১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) সকাল ১০টা ১০ মিনিটে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কবি। সেদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।
নজরুল ও মাদারীপুরের সম্পর্ক সংরক্ষণে স্মৃতিস্তম্ভের দাবি
কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বিদ্রোহী কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাম্য, মানবতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর সাহিত্য ও সংগীত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গণআন্দোলনে মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।
মাদারীপুরের বিপ্লবী ইতিহাস, শান্তিসেনা বাহিনীর আত্মত্যাগ এবং কবির সঙ্গে এই অঞ্চলের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বাংলা সাহিত্য ও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’, ‘জাতের নামে বজ্জাতি’, ‘ধীবরদের গান’ এবং ‘সন্ধ্যা’ কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গের মতো রচনাগুলো এই সম্পর্কের স্মারক হয়ে আছে।
এই ঐতিহাসিক যোগসূত্রকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে মাদারীপুরে একটি নজরুল স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন এবং কবির সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক স্থানগুলো সংরক্ষণ সময়ের দাবি। এতে শুধু নজরুলের স্মৃতিই সংরক্ষিত হবে না, বরং মাদারীপুরের বিপ্লবী ইতিহাস ও বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।











