কেউ বলেন প্রেম জীবনে একবার আসে, কেউ বলেন বারবার। আবার কারও প্রথম প্রেম এমনই সর্বনাশা রূপ নেয় যে দ্বিতীয়বার দাঁড়ানোর শক্তিটাই মুছে যায়। কিন্তু এলেনা সাদিকুর জীবনের গল্পটা সম্পূর্ণ আলাদা। ফুটবলকে ভালোবেসে খেলোয়াড় হিসেবে সব হারিয়েছিলেন তিনি। হাঁটুতে ১৩টি অস্ত্রোপচার, সেপসিসের সংক্রমণ এবং পা কেটে ফেলার শঙ্কা অতিক্রম করে ৩২ বছর বয়সে সেই ফুটবল বিশ্বেই জয়ী হয়েছেন এই নারী। এলেনা সাদিকু এখন ব্যালন ডি’অরের বর্ষসেরা নারী কোচের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন, যা তাঁকে ফুটবলের সর্বোচ্চ মর্যাদার মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছে। আবারও ভিলা পার্কে হোঁচট, মৌসুমে প্রথম হার ম্যানচেস্টার সিটির।
ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ইতিহাস
৩২ বছর বয়সী এলেনা সাদিকু এখন ব্যালন ডি’অরের বর্ষসেরা নারী কোচের পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নিয়ে অনন্য ইতিহাস গড়েছেন। পুরুষ ও নারী ক্যাটাগরি মিলিয়ে তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ কোচ। শুধু তা-ই নয়, এই বছরের বর্ষসেরা নারী কোচের সংক্ষিপ্ত তালিকায় নাম থাকা একমাত্র নারীও তিনি। ৯ বছর আগের এক বিভীষিকাময় চোটের স্মৃতি পার করে আজ বিশ্ব ফুটবলের এলিট তালিকায় তাঁর অন্তর্ভুক্তিকে অনেকে অলৌকিক বলে আখ্যা দিচ্ছেন। আর কী আশ্চর্য, প্রথম প্রেমে প্রত্যাখ্যাত মেয়েটি দ্বিতীয় প্রেমে এমন সফল যে ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারের মঞ্চেও পৌঁছে গেছেন।
২০১৭ সালের জুনের সেই বিভীষিকাময় পোস্ট
এই বিরল সাফল্যের নেপথ্যের ইতিহাস বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০১৭ সালের জুনে। সেই সময় ২৩ বছর বয়সে নিজের ইনস্টাগ্রাম আইডিতে ফুটবল ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে এলেনা লিখেছিলেন যে তাঁর হাঁটুর মিনিস্কাস সম্পূর্ণ ছিঁড়ে গেছে এবং এসিএল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চোট পাওয়ার পরও যেভাবে আরও ২০ মিনিট মাঠে খেলেছিলেন, তা ভেবে তিনি নিজেও পরে অবাক হন। ৯ বছর আগের সেই আবেগঘন পোস্টের কথাগুলো স্মরণ করলে মনে হয়, মানুষ কখনো কখনো অজান্তেই নিজের ভবিষ্যৎ নিজে লিখে রাখে। সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘আঠারো বছর বয়স মাথা নোয়াবার নয়। এলেনাকে দেখলে কবি হয়তো বত্রিশ বছর বয়স নিয়েও অমন একটা কবিতা লিখতেন। সুযোগ কাজে লাগিয়ে সিটির পাশে আর্সেনাল। ইএসপিএনকে নিজের চোটের বিবরণ দিতে গিয়ে এমনভাবে বলেছিলেন, যেন শরীরের ভেতর আস্ত একটা হাসপাতালের ইতিহাস নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এমন চোটের পর সাধারণ কোনো ফুটবলারের মাঠে ফেরার কথা ভাবতেও ভয় পাওয়ার কথা।
যুদ্ধবিধ্বস্ত শৈশব থেকে ফুটবলের ড্রেসিংরুম
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় চরম গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে পরিবারের সঙ্গে কসোভো ছেড়ে জার্মানিতে পাড়ি জমান এলেনা। সেখানে এক শরণার্থী শিবিরে কাটতে থাকে শৈশবের দিনগুলো। অনিশ্চিত ও আতঙ্কিত শৈশবে একটা ফুটবলই হয়ে উঠেছিল তাঁর পরম বন্ধু। বাড়ির বাগানে দুই ভাইয়ের সঙ্গে বল খেলা দিয়ে যার শুরু। শরণার্থী জীবনে ঘরবাড়ির সঙ্গে শৈশব হারিয়ে গেলেও এলেনার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন হারিয়ে যায়নি। ১৩ বছর বয়সে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন যে পেশাদার ফুটবলার হবেন। অবশ্য এলেনার জীবনটা শুরু থেকেই খুব সহজ ছিল না। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় যুদ্ধের আগুন জ্বলছে। বাড়ির বাগানে ভাইয়ের সঙ্গে খেলতে খেলতে কখন যে বলটার প্রেমে পড়ে গেলেন, নিজেও বুঝতে পারেননি, ‘ফুটবল হয়ে ওঠে আমার আবেগ, আমার ভালোবাসা, আমার নিরাপত্তার আশ্রয়, আমার সবকিছু।’।
মাঠের স্ট্রাইকার থেকে চতুর মিডফিল্ডার
এলেনা সাদিকুর ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল একজন দুর্দান্ত স্ট্রাইকার হিসেবে, যাঁর মূল কাজ ছিল গোল করা। তবে দ্রুতই কোচরা আবিষ্কার করেন যে মেয়েটি শুধু গোল করতেই জানে না, বরং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ও খেলার গতি আগেভাগেই পড়তে পারে। ফলে তাঁকে নিয়ে আসা হয় মাঝমাঠে। ফুটবলে মিডফিল্ডারদের দাবাড়ুর মতো কয়েক চাল আগেই চিন্তা করতে হয়। এলেনা মাঠের বাইরে রসিক ও হাসিখুশি হলেও মাঠে পা রাখা মাত্রই হয়ে উঠতেন অত্যন্ত শান্ত, ধীরস্থির এবং দূরদর্শী এক পরিপক্ব চালক। ১১ বছর পর প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে ফিরছেন রোনালদিনিও। তখন কি আর জানতাম, ওটাই আমার শেষ ম্যাচ হতে পারে। প্রতিপক্ষের পরের চালটা যেন আগেই বুঝে যায়।
২৩ বয়সে হ্যামারবির অধিনায়ক ও এসিএল ট্র্যাজেডি
২৩ বছর বয়সে সুইডেনের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব হ্যামারবির অধিনায়ক হওয়ার মাধ্যমে এলেনার নেতৃত্বের সক্ষমতা ফুটে ওঠে। কিন্তু ভাগ্য তাঁর জন্য অন্য রকম এক বেদনাদায়ক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। ১৯ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো বাঁ হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট বা এসিএলে চোট পান তিনি, যা যেকোনো অ্যাথলেটের জন্য বড় দুঃস্বপ্ন। এর পর থেকে একের পর এক চোট তাঁর পিছু ছাড়ে না। খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর বাঁ হাঁটুতেই মোট ১৩টি জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করতে হয়েছিল।
১৩টি অস্ত্রোপচার ও ক্যাডাভার গ্রাফটের ব্যবহার
বাঁ হাঁটুতে তিনবার এসিএল ছিঁড়ে যাওয়া ছাড়াও এলেনার পুরো পা পুনর্গঠন করতে হয়। ২০১৪ সালে একবার তাঁর এসিএল, মিডিয়াল কোলাটারাল লিগামেন্ট (এমসিএল), ল্যাটারাল কোলাটারাল লিগামেন্ট (এলসিএল) এবং মিনিস্কাস একযোগে ছিঁড়ে গিয়েছিল। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে প্রথমবার পুনর্বাসন শেষে মাঠে ফিরেই হ্যাটট্রিক করেন তিনি। কিন্তু এসকিলস্টুনা ইউনাইটেডের অনুশীলনে দুই বেলার ব্যবধানে আবারও এসিএল ও এলসিএল ছিঁড়ে যায়। এই সময় টিবিয়া বা জঙ্ঘাস্থির হাড় কেটে পুনর্গঠন করতে চিকিৎসকদের ক্যাডাভার গ্রাফট (মৃতদেহের টিস্যু) ব্যবহার করতে হয়েছিল। কসোভো-আলবেনিয়ান বংশোদ্ভূত পরিবারটি পরে নিজেদের দেশে ফিরেছিল; কিন্তু যুদ্ধ আবারও তাঁদের ঘরছাড়া করে। পায়ের হাড় সঠিক অবস্থানে রাখতে বসানো হয় চারটি স্ক্রু।
চিকিৎসকদের কঠোর পরামর্শ ও জীবনসংগ্রাম
একের পর এক চোটের পর দ্য টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এলেনা জানান, চিকিৎসকেরা তাঁকে সোজা বলে দিয়েছিলেন, ‘এলেনা, তোমার খেলা ছেড়ে দেওয়া উচিত, যাতে অন্তত স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারো।’ যে তরুণীর কাছে ফুটবলই ছিল অস্তিত্ব, তাঁর জন্য এই বার্তা ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর। কিন্তু চিকিৎসকদের সেই বিধিনিষেধ ও পরামর্শ উপেক্ষা করে ১৮ মাস পর আবারও বুট পায়ে মাঠে ফেরেন এলেনা। দুঃখজনকভাবে, সেই গ্রীষ্মেই তৃতীয়বারের মতো তাঁর বাঁ হাঁটুর এসিএল আবার ছিঁড়ে যায়।
অস্ত্রোপচারের পর সেপসিস ও ১০ কেজি ওজন হ্রাস
তৃতীয় অস্ত্রোপচারের পর এক রাতে ভাই ও বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল দেখার সময় হাঁটুতে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয় এলেনার। হাসপাতালে নেওয়ার পর পরীক্ষা করে জানা যায় তাঁর হাঁটুতে ভয়ানক সংক্রমণ ও সেপসিস দেখা দিয়েছে। সিআরপি টেস্টের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে মারাত্মক বেড়ে যায়। এলেনার শরীরের ওজন একপর্যায়ে ১০ কেজি কমে যায় এবং চিকিৎসকেরা সপ্তম অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর বাঁ পা কেটে ফেলার পরামর্শ পর্যন্ত দিতে বাধ্য হন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও এলেনা কেবল ভাবতেন কীভাবে আবার ফুটবল মাঠে ফেরত আসা যায়।
ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ও কোচের নতুন ভূমিকা
অবশেষে চিকিৎসকদের চিকিৎসায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এলেও খেলোয়াড় এলেনার ক্যারিয়ার চিরতরে শেষ হয়ে যায়। চোটের মাত্র চার মাস পর নিজেকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করেন তিনি। এবার ফুটবলার হিসেবে নয়, কোচ হিসেবে। হ্যামারবি ক্লাবের উইমেন্স একাডেমির দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব পেলে তা সানন্দে গ্রহণ করেন। জীবনের ট্যাটুতে আঁকা ‘প্রতিটি পরিস্থিতিতে ইতিবাচক কিছু খোঁজা’র যে বিশ্বাস, তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করে কোচিং জগতে পা রাখেন এই অদম্য নারী।
সেল্টিকের দায়িত্ব ও ইউরোপিয়ান ফুটবলে সাফল্য
হ্যামারবি ছাড়াও চীনের বেইজিং বিজি ফোনিক্স এবং সুইডেনের একাধিক ক্লাবে কাজ করার পর এভারটনের অনূর্ধ্ব-২১ দলের কোচের দায়িত্ব পান এলেনা। ২০২৪ সালে স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত ক্লাব সেল্টিকের নারী দলের প্রধান কোচ হিসেবে যোগ দেন। তাঁর অধীনেই সেল্টিক ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করে এবং ক্লাবটি তাদের অর্জিত সাফল্যের মাধ্যমে ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। এলেনার হাত ধরে ক্লাবটির এই উত্থান তাঁকে ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নিতে মূল ভূমিকা রাখে।
ইতিহাস তৈরি করা হ্যাকেনের ঐতিহাসিক সাফল্য
সুইডিশ ক্লাব হ্যাকেনের হয়ে কোচিং করানোর সময়েও বড় কৃতিত্ব দেখান এলেনা সাদিকু। ক্লাবটির ৫৬ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্যে তিনিই প্রথম কোচ, যাঁর পরিচালনায় দলটি তাদের প্রথম ইউরোপিয়ান শিরোপা জয় করার স্বাদ পায়। মাত্র ৩২ বছর বয়সেই একজন ট্যাকটিশিয়ান হিসেবে নিজেকে বিশ্বমঞ্চে বিশ্বস্ত করে তুলেছেন তিনি। যে হাসপাতালের বিছানায় ৯ বছর আগে পঙ্গু হওয়ার আশঙ্কায় চিকিৎসাধীন ছিলেন, সেখান থেকে উঠে এসে আজ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা কোচের তালিকায় নাম লেখানো এলেনা সাদিকুর জীবনের অন্যতম সেরা রূপকথা।
















