কিশোরগঞ্জের ভৈরবের তরুণ উদ্যোক্তা ইয়াসিন আরাফাত টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়েও পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন কৃষি ও গবাদি পশু পালন। ২০১৮ সালে মাত্র চারটি গাভি নিয়ে পাশের উপজেলা কুলিয়ারচরের ফরিদপুর গ্রামে তিনি গড়ে তোলেন ‘বস এগ্রো ফার্ম’। সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগ আজ দেড় শতাধিক গরুর বড় খামারে রূপ নিয়েছে। জাতীয় বস্ত্রপ্রকৌশল ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ডিগ্রি সম্পন্ন করেও তিনি শিল্পের গণ্ডি পেরিয়ে কৃষিখাতে যে সাফল্য দেখিয়েছেন, তা অনেকের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে। জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের ভৈরব শহরের ভৈরব বাজার রমজান মিয়ার হাউলি এলাকার ফজলুর রহমানের ছেলে ইয়াসিন আরাফাত। এতেও তার বেশ একটা লভ্যাংশ থাকে বলে জানান তিনি। তিনি খামারকে একটি সম্ভাবনাময় সেক্টর হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এখানে কেউ আসতে চাইলে এই সেক্টরকে ভালোবাসতে হবে। যারা এই সেক্টরে আসতে চায়, তারা যেন এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসেন। অন্যথায় না আসাই ভালো বলে তার অভিমত।
ইয়াসিন আরাফাতের খামারে বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫টি দুগ্ধবতী গাভি রয়েছে, যেখান থেকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৫৫০ লিটার দুধ সংগৃহীত হয়। শুরুর দিকে স্থানীয় মিষ্টির দোকানে দুধ পাইকারি বিক্রি করলেও এখন তিনি ভৈরবের জগন্নাথপুরে নিজস্ব কারখানা গড়ে তুলেছেন। বিএসটিআইসহ সরকারি প্রয়োজনীয় অনুমোদনের মাধ্যমে সেখানে দই ও ঘি তৈরি করে সারা দেশে বাজারজাত করা হচ্ছে, যা গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এর বাইরে প্রতি বছর কোরবানির মৌসুমে তিনি শতাধিক পশু প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজা করে বিক্রি করেন। এরমধ্যে ৩০-৩৫টি দুগ্ধ গাভি আছে।
মূলত দেড় একর জায়গায় গড়ে ওঠা এই খামারটি বহুমুখী উদ্যোগের একটি কেন্দ্রবিন্দু। এখানে মাছ চাষ, হাঁস ও দেশি মুরগি পালন এবং আঙিনায় বিভিন্ন ফলের বাগান করা হয়েছে, যা পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি আয়ের জোগান দিচ্ছে। এছাড়া খামারের বর্জ্য ব্যবহার করে তিনি একটি বায়ুগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করেছেন। এর মাধ্যমে তাদের রান্নার কাজ যেমন সম্পন্ন হচ্ছে, তেমনি ভবিষ্যতে এই গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জেনারেটর চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে তার। এই খামার ও কারখানায় বর্তমানে অর্ধশত নারী-পুরুষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। সংগত কারণেই তার কাজ করার কথা ফাইবার, সুতা, কাপড় এবং পোশাক তৈরির প্রযুক্তির নানা বিষয় নিয়ে। কিন্তু তিনি কাজ করছেন গরু, দুধ, ঘাস, গোবর, বায়ুগ্যাস, দই, ঘি ইত্যাদি নিয়ে। সেই ছোট্ট ফার্মটি এখন দেড়শরও বেশি গরু নিয়ে বিশাল এক ফার্মে পরিণত হয়েছে। যার প্রায় ৭০ শতাংশই তার ফার্মে উৎপন্ন। দেশীয় প্রাকৃতিক খাদ্য খাওয়ানোর মাধ্যমে পশুগুলো লালিত পালিত হয় বলে তার খামার থেকে পছন্দের পশুটি কিনে নিয়ে যান আশপাশের ক্রেতারা। খামারের চারপাশে রোপণ করেছেন কলা, মরিচ, লেবু, আম, জামসহ নানান ফলের গাছ। এসব থেকে আহরিত ফলফলাদি পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করেও অর্থ উপার্জন হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে তিনি এই প্ল্যান্টটি আরো সম্প্রসারিত করে গ্যাস দ্বারা চালিত জেনারেটর তৈরি করবেন। যাতে তাদের বিদ্যুতের সমস্ত চাহিদা পূরণ হয়ে যায় বলে জানালেন তিনি। তারা খামারের যত্ন-পরিচর্যা ছাড়াও দই, ঘি তৈরি ও প্যাকেজিং কাজ করে থাকেন। আবেগ দিয়ে, মায়া দিয়ে কাজ করতে হবে।
ইয়াসিন আরাফাতের মতে, সফল হতে হলে শুধু অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট নয়, বরং কাজে দক্ষতা ও আন্তরিকতা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, কৃষি ও গবাদি পশুর মতো সম্ভাবনাময় এই খাতকে ভালোবেসে কাজ করলে যে কেউ সফল হতে পারেন। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে মানসম্মত পণ্য সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। শুধু নিজেই সফল হননি, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন শত শত মানুষের। যে যে কাজে দক্ষতা অর্জন করবে, সে সেক্ষেত্রে ভালো করবে।
তার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ভৈরব উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শাহীনুল হক। তিনি বলেন, একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণ খামারি হিসেবে ইয়াসিনের সফলতা প্রশংসনীয়। তার মতো উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সরকারি সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন তিনি। ভৈরব সরকারি মহিলা কলেজের প্রভাষক মনোয়ারা পারভীন বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখায় ইয়াসিন প্রশংসার দাবি রাখেন। চাকরির পেছনে না ছুটে তিনি যেভাবে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন, তা দেশের যুব সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। আর এই ভিন্ন পেশায় গিয়েও সফলতা পেয়েছে দারুণভাবে।

















