সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মাত্র পোস্টকে কেন্দ্র করে ভারতের তরুণ সমাজের আইকন হয়ে উঠেছেন অভিজিৎ দীপকে। বর্তমানে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তিনি সোচ্চার। এই ইস্যুতে শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লিতে আয়োজিত সমাবেশে যোগ দিতে গিয়ে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েন ৩১ বছর বয়সী এই তরুণ নেতা। তাকে আটক করা হয়েছে বলে খবর ছড়ালেও পুলিশের দাবি, আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে তাকে শুধু সহায়তার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। ৩১ বছর বয়সী দীপকে ভারতের দলিত সম্প্রদায়ের একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। অনলাইনে জনপ্রিয়তা পাওয়া এই উদ্যোগ অল্প সময়ের মধ্যে তরুণদের আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ককে কেন্দ্র করে আবারও রাজপথে নেমেছেন তারা।
দীপকে ও তার সমর্থকরা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামক একটি প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে আন্দোলন পরিচালনা করছেন। এই নামটির উৎপত্তি মূলত গত মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্য থেকে। সে সময় বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বলে আখ্যায়িত করা হলে দীপকে তার প্রতিক্রিয়ায় লিখেছিলেন, ‘সব তেলাপোকা যদি একসঙ্গে জড়ো হয়, তাহলে কী হবে?’ এই ছয় শব্দের পোস্টটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং তরুণদের ক্ষোভকে সংগঠিত করার একটি নতুন পথ খুলে দেয়।
শিক্ষার্থী ও বেকারদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনের ফলে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভর্তির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বড় ইস্যুগুলোতে সরকার নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছে। গত ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পেছনে এই ধারাবাহিক বিক্ষোভের ভূমিকা ছিল। এছাড়া সরকারি চাকরির অভাব, বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং শিক্ষা খাতের জবাবদিহির দাবিতে সিজেপি নিয়মিত কর্মসূচি পালন করে আসছে। দলটির ভাষ্যমতে, তারা প্রথাগত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কাজ করছে। চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি ঘিরেও আন্দোলন জোরালো হয়। বেকারত্ব, সরকারি চাকরির সংকট, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ তরুণদের একত্র করে সংগঠনটি।
দিল্লিতে আটকের সময় দীপকে পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও তিনি ভয় পান না। এসময় তার সঙ্গে সংগঠনের জ্যেষ্ঠ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকেও সরিয়ে নেওয়া হয়। যেকোনো পরিস্থিতির মুখেও সমর্থকদের অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শকে পাথেয় করে গণতন্ত্র রক্ষায় এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন এই তরুণ।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা দীপকে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাকে মানুষের জন্য কাজের সুযোগ করে দিয়েছে, যদিও এর জন্য তাকে ও তার পরিবারকে নানা হুমকির মোকাবেলা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের জেরে জানিয়েছে যে, তালিকার অসংগতিগুলো স্বাভাবিক এবং বাদ পড়া ব্যক্তিরা পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়া নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও নাগরিক অধিকারের ওপর বড় ধরনের আঘাত। মূলত, নিছক একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও ভোটাধিকারের মতো জাতীয় ইস্যুতে রূপ নিয়ে বর্তমান মোদি সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন বলছে, খসড়া তালিকা সংশোধনের সময় বিভিন্ন কারণে কিছু নাম চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তালিকা থেকে ভুলভাবে বাদ পড়া ভোটাররা পুনরায় নিবন্ধন করতে পারবেন। বিক্ষোভ ঠেকাতে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের পাশাপাশি যান চলাচল ও টেলিযোগাযোগেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

















