সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন ‘ভাই’ পরিচয়ের এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী চক্রের আধিপত্য। পেশা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে অনেক ক্ষেত্রে উত্তর আসে—’আমি অমুক ভাইয়ের সঙ্গে আছি’। এই ‘ভাই’ পরিচয়টি স্থানীয় পর্যায়ে মাস্তানি, দখলবাজি এবং চাঁদাবাজির এক স্বীকৃত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চক্রের সদস্যরা শুধু সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করে ক্ষান্ত হচ্ছে না, বরং শিল্পপতি, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নাগরিকদের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজির ভয়ে অনেকে এলাকাছাড়া হচ্ছেন কিংবা নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। এমনকি ব্যাংক ঋণের প্রক্রিয়াও এখন এই চক্রের নজরদারিতে, যেখানে ব্যাংক ম্যানেজাররা পর্যন্ত তাদের চাপের মুখে থাকেন। আসলে ‘ভাই’ কী করেন এলাকার সবাই জানেন। উপরের তলায় খবর পাঠায়-স্যার, তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। শিল্পপতিরা মাস শেষে তাকে সম্মানী পাঠান। নতুন কোনো শিল্পকারখানা গড়ার চেষ্টা করছেন না অনেকে। ব্যাংক থেকে কবে, কখন, কাকে ঋণ দেয়া হচ্ছে এই নেটওয়ার্কও চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে। ব্যাংক ম্যানেজারদেরকেও তারা শাসিয়ে আসে।
চাঁদাবাজির এই নেটওয়ার্ক শহর, বন্দর, গ্রাম—সর্বত্রই বিস্তৃত। রাজধানী ঢাকার ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের উদ্যোক্তারা এই চক্রের কাছে জিম্মি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এই পরিস্থিতির শিকার, যাদের অনেক সময় নির্ধারিত মাসোহারা দেওয়ার পাশাপাশি নিম্নমানের পণ্য নিতে বাধ্য করা হয়। শাসক দলের ছত্রছায়ায় এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সহায়তায় গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্ক এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। কিশোর গ্যাং থেকে শুরু করে বালুমহাল ইজারা কিংবা কবরের মাটি কেনা—সবকিছুতেই এই ‘ভাই’দের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত। এমনকি মব সন্ত্রাস বা রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঘটনাগুলোও জনমনে গভীর উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। হালে আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধেও দখলবাজির বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে, যার প্রেক্ষিতে ঢাকায় এক আইনপ্রণেতাকে সরানোর ঘটনাও ঘটেছে। শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে সব জায়গাতে একই চিত্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহিতার অভাবই এই চাঁদাবাজির মূল কারণ। স্থানীয় প্রশাসন অনেক সময় ‘ভাই’দের ইশারায় চলে, আর যারা অনমনীয় থাকতে চায়, তাদের বদলি করা হয় দুর্গম এলাকায় কিংবা ওএসডি করা হয়। এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আপনারা সবসময়ই আমাদের দোষারোপ করেন যে আমরা দেখেও নাকি দেখি না। কিন্তু পোস্টিং ও প্রমোশনের পেছনে যে অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়, তা ওঠাতে গিয়ে অনেক সময় পুলিশ কর্মকর্তাদেরও এই চাঁদাবাজ চক্রের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হয়। স্থানীয় পর্যায়ের নিয়োগ থেকে শুরু করে বিদেশগামী বাংলাদেশিদের ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রেও এই নেটওয়ার্কের সক্রিয় হস্তক্ষেপ বিদ্যমান। বিখ্যাত চাঁদাবাজ হিসেবে তার নাম চারদিকে।
এই চাঁদাবাজির ধরণ ও পদ্ধতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে অর্জিত টাকা বিদেশি ব্যাংকে জমা রাখা হলেও, বর্তমানে ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে, যা লেনদেনকে আরও আড়ালে রাখতে সহায়তা করছে। রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদাবাজের ফরম্যাট বা দলের নাম বদলালেও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয় না। সাধারণ মানুষ সবসময়ই এই ব্যবস্থার শিকার হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অসহায়ত্ব এবং রাজনৈতিক মদতের যোগসাজশ এই অপরাধী নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করছে। একদিকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হারানো, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান কমিশন বাণিজ্যের ফলে সামগ্রিক নিরাপত্তা ও আস্থার জায়গাটি সংকটের মুখে পড়ছে।

















