ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার অষ্টম মাসে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় নতুন করে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াশিংটন। এই অঞ্চলের রণকৌশল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করছে।
মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা আল জাজিরাকে নিশ্চিত করেছেন যে, ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ গত রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের সান দিয়েগো নৌঘাঁটি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। এর ঠিক পরের দিনই দুই হাজারের বেশি মেরিন সেনা নিয়ে মার্কিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (এমইইউ) একই গন্তব্যের পথে রওনা হয়েছে। এর এক দিন পর মার্কিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটও (এমইইউ) রওনা হয়েছে, যাতে ২ হাজারের বেশি মেরিন সেনা রয়েছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে এই নৌবহর ও স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েনের ফলে ওই অঞ্চলে আরও ৯ থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা যুক্ত হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে স্ট্রাইক গ্রুপ ও অন্যান্য জাহাজের নাবিকসহ মেরিন সেনারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। সব মিলিয়ে নভেম্বরের শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তিনটি বিমানবাহী রণতরী এবং দুইটি উভচর অবতরণকারী দল অবস্থান নেবে বলে ওই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সেনা মোতায়েনের অর্থ কী এবং এটি কি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের তীব্রতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
নতুন এই সামরিক বহরে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের সূত্র অনুযায়ী, এর মূল লক্ষ্য হলো কূটনীতির ফলাফল যাই হোক না কেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে সামরিক পদক্ষেপের বিকল্পটি যেন সবসময় খোলা থাকে। এমনকি ইরানের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সেখান থেকে সেনা বা সরঞ্জাম প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই পেন্টাগনের। যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি নির্বাচনে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার তানিয়া নুরি জানিয়েছেন, নতুন এই প্রক্রিয়ায় এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি কোনো নতুন হামলার নির্দেশ দেন, তবে তা বাস্তবায়নের জন্য বাহিনীগুলো সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। সামরিক শক্তির এই বিপুল সমাবেশ প্রেসিডেন্টকে যেকোনো সময় আরও বিস্তৃত পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ করে দেবে।
কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে এ অঞ্চলে প্রায় ১৯টি স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক স্থাপনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এর মধ্যে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে লেবানন সংকটের সময় ওয়াশিংটন সর্বপ্রথম মধ্যপ্রাচ্যে বড় আকারের সেনা পাঠিয়েছিল, যেখানে প্রায় ১৫ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল, যারা স্থায়ী ও ছোট ছোট ঘাঁটিতে অবস্থান করছিল। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা পাঠানোর প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতে কাজ করছেন। এরই অংশ হিসেবে আগে থেকেই আরব সাগরে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের মতো যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হয়েছিল। বর্তমান এই নতুন পদক্ষেপে নির্বাচনী উত্তাপের পাশাপাশি আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকির বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসছে।

















