শরীয়তপুরের নড়িয়ার সুরেশ্বর মাছঘাট এলাকায় পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতের ভাঙনে স্থানীয় তীররক্ষা বাঁধের অন্তত ৫০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এর আগে মঙ্গলবার রাতে বাঁধের ৩৫ মিটার অংশে ফাটল দেখা দিলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করে। ভাঙনের এই আকস্মিকতায় সুরেশ্বর মাছের বাজারের ৫০টি দোকান চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বুধবার দুপুর থেকে ব্যবসায়ীরা দোকানপাট সরিয়ে নেওয়া শুরু করেছেন। তখন দেখেছেন, ঘাটের কাছে বাঁধের একটি অংশে ফাটল ধরেছে।
১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সুরেশ্বর মাছের বাজারটি স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। প্রতিদিন এখানে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয়। প্রায় এক বিঘা জমির ওপর স্থাপিত এই বাজারটির ওপর নির্ভরশীল জেলে, ব্যবসায়ী, আড়তদার ও শ্রমিকসহ অন্তত পাঁচ শতাধিক পরিবার। মাছের বাজারের বর্তমান কাঠামোতে ৪০টি আড়ত, পাঁচটি বরফ বিক্রির দোকান এবং জেলেদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের আরও পাঁচটি দোকান রয়েছে। বর্ষা মৌসুমের শুরুতে পদ্মার ভাঙনে গত দুই দিনে অন্তত ২০টি দোকান এখান থেকে সরিয়ে ফেলতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। তবে বাজারটির আশপাশে কোনো বসতবাড়ি নেই। প্রতিদিন ভোর থেকে জেলেরা নৌকা নিয়ে মাছঘাটে আসেন।
দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে পদ্মায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৫৫ বছর বয়সী লিয়াকত প্রধানিয়া। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সকালেও যেখানে নৌকা বেঁধেছিলেন, রাতের ভাঙনে সেই ঘাট বিলীন হয়ে গেছে। একই অভিজ্ঞতা দ্বীন ইসলামের, যিনি ২০ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছেন। নদীর তীররক্ষা বাঁধের কারণে গত পাঁচ বছর ভাঙনমুক্ত থাকলেও বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎ বাঁধ তলিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি। তিনি জানান, বর্তমানে খোলা আকাশের নিচে মাছ বিক্রির মতো নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল সকালে নড়িয়ার ঘড়িষার ইউনিয়নের সুরেশ্বর মাছঘাট এলাকায় পদ্মার তীরে দাঁড়িয়ে ৫৫ বছর বয়সী লিয়াকত প্রধানিয়ার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ভোরে যে ঘাটে নৌকা বাঁধতেন, গতকাল শুক্রবার সকালে এসে দেখেন, সেই ঘাট আর নেই। মাছের বাজারে মাছ বিক্রি করে আবার পদ্মায় গেছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, ২০১৮ সালে জাজিরার শফি কাজীর মোড় থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর মাছঘাট পর্যন্ত ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয়, যা ২০২৩ সালে শেষ হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের ১ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার তিন বছরের মাথায় এমন ভাঙন স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত সুরেশ্বর এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি অতীতে আটবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন এবং ২০১৭ সালে সহায়-সম্বল হারিয়ে এই বাজারের পাশে দোকান দিয়েছিলেন, এখন সেই দোকানটিও সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
ভাঙনের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পাউবোর প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যাওয়ায় নদীর তলদেশের মাটি সরে যাচ্ছে, যা এই ভাঙনের অন্যতম কারণ। নিয়মিত পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, গত ২৫ সেপ্টেম্বরের সমীক্ষা অনুযায়ী বাঁধের কাছাকাছি নদীর গভীরতা ছিল ১০ থেকে ২২ মিটার, যা স্বাভাবিক অবস্থায় ৩ থেকে ৭ মিটার হওয়ার কথা। বুধবারের জরিপে সেই গভীরতা ১৮ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত পাওয়া গেছে। নদীর অস্বাভাবিক এই গভীরতা ও স্রোতের তোড়ে তলদেশের মাটি সরে যাওয়ায় তীররক্ষা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শরীয়তপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মিলটন হোসেন জানিয়েছেন, ভাঙন রোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার মতো জরুরি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুম শেষে ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি স্থায়ীভাবে সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। এদিকে, ঘড়িষার ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম দেওয়ান জানান, ৭০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী এই মাছের বাজার রক্ষায় সরকারিভাবে দ্রুত টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। স্থানীয় জেলেদের রুটিরুজির স্বার্থে এই বাজারটি টিকিয়ে রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে।












