যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেছেন, মানবিক সহায়তার উদারতা কখনোই রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত এই সভায় তিনি স্পষ্ট করেন যে, অনির্দিষ্টকাল ধরে রোহিঙ্গাদের ভার কেবল বাংলাদেশের একার পক্ষে বহন করা অসম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা নিপীড়নের শিকার। জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার অতীতে সফলতার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করেছিল। তবে ২০১৭ সালে নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটে। বর্তমানে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ এক বিশাল মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। সীমান্ত খুলে দিয়ে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যবস্থা করলেও দীর্ঘমেয়াদে শরণার্থী শিবিরগুলো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অথচ প্রয়োজনের তুলনায় আন্তর্জাতিক সহায়তা দিন দিন কমছে। ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালের জন্য সহায়তা কমিয়ে ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা উদ্বেগজনক।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, সংকটের মূল উৎপত্তি সেখানে, তাই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। তবে সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকায় নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি জরুরি প্রস্তাব তুলে ধরেন
১. আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সমন্বয়ে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। ২. মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার আস্থা পায়। ৩. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। ৪. আইসিজে ও আইসিসি-সহ আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়াগুলোকে সহায়তা দিয়ে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ৫. মাদক, মানবপাচার ও অবৈধ অস্ত্রের মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুনরায় দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত হয়ে থাকুক। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হলো প্রতিশ্রুতি থেকে বেরিয়ে এসে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। রোহিঙ্গাদের জীবন যেন কেবল নিপীড়নের গল্প হয়ে না থাকে, বরং ন্যায়বিচার ও মর্যাদার গল্প হয়ে ওঠে—সেই প্রক্রিয়া এখনই শুরু করা প্রয়োজন।

















