আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা আল-আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ প্রেরণ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ কর।’ এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, দরূদ পাঠ করা কেবল একটি নফল আমল নয়, বরং এটি আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় একটি ইবাদত এবং রাসূল (সা.)-এর প্রতি একজন মুমিনের ভালোবাসার বাস্তব বহিঃপ্রকাশ। তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ কর।” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৬)» এই একটি আয়াতই প্রমাণ করে যে দরূদ পাঠ করা কেবল একটি নফল আমল নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রিয় একটি ইবাদত এবং রাসূল ﷺ–এর প্রতি ভালোবাসার বাস্তব প্রকাশ।
দরূদ পাঠের ফজিলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বাণী দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করেন, তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেন এবং তার মর্যাদা দশ ধাপ বৃদ্ধি করেন’ (সুনান আন-নাসাঈ, হাদিস: ১২৯৭; ইমাম আলবানী রহ. এটি সহিহ বলেছেন)। এই হাদিসটি অনুধাবন করলে বোঝা যায়, প্রতিদিন নিয়মিত দরূদ পাঠ করলে একজন মুসলিম অগণিত রহমত ও ক্ষমা লাভের সুযোগ পায়। সহিহ বলেছেন)» ভাবুন, আপনি যদি প্রতিদিন ১০০ বার দরূদ পাঠ করেন, তবে আল্লাহর অগণিত রহমত, ক্ষমা ও মর্যাদা লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
রাসূল (সা.)-এর নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীন দরূদকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নিয়েছিলেন। তিরমিযি শরীফের একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরূদ পাঠ করেছে’ (জামি’ আত-তিরমিযী, হাদিস: ৪৮৪; হাসান)। এছাড়াও, দোয়ার কবুল হওয়ার ক্ষেত্রে দরূদ একটি বড় শর্ত। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে ঝুলে থাকে এবং রাসূল (সা.)-এর ওপর দরূদ পাঠ না করা পর্যন্ত তা আল্লাহর দরবারে পৌঁছায় না (জামি’ আত-তিরমিযী, হাদিস: ৪৮৬)। পৃথিবীতে আমরা যত বেশি দরূদ পড়ব, ইনশাআল্লাহ কিয়ামতের দিন তত বেশি রাসূল ﷺ–এর নৈকট্য লাভের আশা করতে পারি।
একজন মুমিনের জন্য দরূদ থেকে গাফিলতি অনেক বড় বঞ্চনার কারণ হতে পারে। তিরমিযি শরীফের হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘কৃপণ সেই ব্যক্তি, যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হলো অথচ সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করল না’ (জামি’ আত-তিরমিযী, হাদিস: ৩৫৪৬; সহিহ)। এছাড়া দুশ্চিন্তা লাঘবের মাধ্যম হিসেবেও দরূদের ভূমিকা অপরিসীম। উবাই ইবন কা’ব (রা.) যখন রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, তিনি তার সমস্ত দোয়া যদি দরূদে ব্যয় করেন তবে কী হবে, তখন রাসূল (সা.) উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তাহলে তোমার সব চিন্তা দূর হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে’ (জামি’ আত-তিরমিযী, হাদিস: ২৪৫৭; হাসান)। তবে সহিহ হাদিসে এমন অসংখ্য ফজিলত এসেছে, যা আমাদেরকে অধিক পরিমাণে দরূদ পাঠে উদ্বুদ্ধ করে। একদিন রাসূল ﷺ–কে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি তাঁর দোয়ার কতটুকু অংশ দরূদের জন্য নির্ধারণ করবেন। বিভিন্ন পরিমাণ উল্লেখ করার পর তিনি বললেন, “আমি যদি আমার সমস্ত দোয়াই আপনার ওপর দরূদে ব্যয় করি।
বিশেষ করে জুমার দিনে দরূদ পাঠের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। তাই এ দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করো’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭; সুনান আন-নাসাঈ)। পরিশেষে, একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, ‘হাশরের মাঠে জিহ্বা সাক্ষ্য দেবে যে তুমি সবচেয়ে বেশি দরূদ পড়েছ’—এই প্রচলিত কথাটি কোনো সহিহ হাদিস নয়। তাই একে হাদিস বলে প্রচার করা থেকে বিরত থাকা উচিত। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত লোক দেখানো আমল নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রাসূল (সা.)-এর প্রকৃত ভালোবাসায় নিয়মিত দরূদ পাঠ করা। আমাদের সবার উচিত প্রতিদিন দরূদ পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং আল্লাহর দরবারে তাঁর রহমত ও রাসূল (সা.)-এর শাফাআত প্রার্থনা করা।













