টোকিওতে টানা ৩৫ দিনের রেকর্ড বৃষ্টির পর আকাশ পরিষ্কার হওয়ার রেশ থাকতেই বাংলাদেশের সিনেমার জন্য এল সুখবর। টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (টিফ) ৩৯তম আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। রুবাইয়াৎ হোসেন পরিচালিত এই সিনেমাটি উৎসবের প্রায় চার দশকের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকল। টানা ৩৫ দিনের রেকর্ড বৃষ্টির পর গতকাল বৃহস্পতিবার সুনীল ছিল টোকিওর আকাশ। রৌদ্রোজ্জ্বল এই দিনের আবহেই এল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য দারুণ এক সুসংবাদ। টোকিওর স্পাইরাল হলে গতকাল যখন উৎসবের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছিল, তখন শুধু বিভিন্ন চলচ্চিত্রের নাম নয়; বরং আভাস পাওয়া গেল বিশ্ব চলচ্চিত্রের চলমান গতিধারার। সিনেমার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে একসূত্রে বাঁধার অঙ্গীকার নিয়ে টিফ এবার সাজিয়েছে পাঁচটি প্রতিযোগিতামূলক বিভাগসহ বিস্তৃত আয়োজন। হিসামাৎসু বলেন, ‘আমরা চাই টিফকে ঘিরে অন্যান্য বড় উৎসবের মতোই মানুষ টোকিওতে একত্র হোক, আর এ বছরের আয়োজন আগামী বছরের আরও জাঁকজমকপূর্ণ ৪০তম আসরের ভিত্তি গড়ে দিক।’।
পরিচালক রুবাইয়াৎ হোসেনের চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। বাংলাদেশ, ফ্রান্স, পর্তুগাল, নরওয়ে ও জার্মানির যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই ছবিতে ঢাকার এক হবু কনের গল্প ফুটে উঠেছে। বিয়ের প্রস্তুতি, পারিবারিক প্রত্যাশা ও সামাজিক রীতিনীতির জটিল ঘেরাটোপে নারীর শরীর ও মনের অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতাই ছবির উপজীব্য। বাস্তবতার সঙ্গে স্বপ্ন, স্মৃতি ও অলৌকিকতার সংমিশ্রণে এটি সমাজ ও নারীর বিয়ের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এর আগে ভেনিস ও টরন্টো উৎসবে প্রশংসিত হয়েছে এই নির্মাণ।
এ বছরের উৎসবের স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সংযোগ-চলচ্চিত্র আমাদের বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করে’। এই ধারণাকে সামনে রেখে আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ১০ দিনব্যাপী আয়োজনে টোকিও পরিণত হবে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মিলনক্ষেত্রে। উৎসবের প্রধান ভেন্যু হিবিয়া, ইউরাকুচো, মারুনোউচি এবং গিনজা এলাকাকে ঘিরে থাকছে ২০০টিরও বেশি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী। গত বছরের ১৮৪টি ছবির তুলনায় এবার প্রদর্শিত হবে ২০৪টি চলচ্চিত্র। উৎসবের উদ্বোধনী রেড কার্পেট অনুষ্ঠানটি হিবিয়া-নাকাদোরি অ্যাভিনিউতে হওয়ার কথা রয়েছে।
উৎসবের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে ১৫টি ছবি লড়বে, যেগুলো ১১২টি দেশ ও অঞ্চলের ১ হাজার ৮৯২টি আবেদনের মধ্য থেকে নির্বাচিত হয়েছে। জুরি বোর্ডের নেতৃত্বে থাকছেন অস্ট্রেলিয়ান নির্মাতা রলফ ডি হিয়ার। তাঁর সঙ্গে জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন অ্যালেক্স লো, ওহ জংওয়ান, ইয়োভ মুর এবং অভিনেত্রী ওয়াতানাবে মাকিকো। এ ছাড়া এশীয় তরুণ নির্মাতাদের নিয়ে ‘এশিয়ান ফিউচার’ বিভাগে ১০টি ছবি প্রদর্শিত হবে। এগুলোকে বেছে নেওয়া হয়েছে ১১২টি দেশ ও অঞ্চল থেকে জমা পড়া ১ হাজার ৮৯২টি চলচ্চিত্র থেকে।
উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে থাকছে তাকাহিসা জেজের ‘সুকিয়াকি’ এবং সমাপনী ছবি হিসেবে প্রদর্শিত হবে ইয়ন সাং-হোর কোরিয়ান জম্বি থ্রিলার ‘কলোনি’। উৎসবের নতুন পরিচালক হিসামাৎসু তাকেও জানান, তাঁরা টিফকে বিশ্বমঞ্চের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে চান এবং নারী নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক যাত্রা আরও বেগবান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। উৎসবের পাশাপাশি ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর টিফকম বাজারে অডিওভিজ্যুয়াল কনটেন্টের ব্যবসায়িক আদান-প্রদান হবে। হামামাৎসুচো-কান ভবনে আয়োজিত এই বাজারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২৪টি চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশন প্রকল্প যৌথ প্রযোজনা ও অর্থায়নের সুযোগ খুঁজবে। আর সেন্টারপিস হিসেবে থাকছে ইয়ামাজাকি তাকাশির ‘গডজিলা মাইনাস জিরো’, যা ‘গডজিলা মাইনাস ওয়ান’-এর অস্কারজয়ী ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস দলের নির্মিত মহাকাব্যিক এক সিক্যুয়েল। তাঁর লক্ষ্য হচ্ছে, চলচ্চিত্রে বৈচিত্র্য ও প্রাণশক্তিকে দৃশ্যমান করা, জাপানি ও এশীয় নির্মাতাদের বৈশ্বিক পরিসরে এগিয়ে নেওয়া, নারী নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক যাত্রা জোরদার করা এবং টিফকে বিশ্বমঞ্চে প্রবেশের কার্যকর দ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
এবারের উৎসবে অ্যানিমেশন বিভাগ বরাবরের মতোই আকর্ষণীয়। অ্যানিমেশন উপদেষ্টা ফুজিৎসু রিওতা জানান, এখানে ৯টি নতুন জাপানি ও আন্তর্জাতিক ছবি থাকছে। জাতীয় চলচ্চিত্র আর্কাইভের সঙ্গে যৌথভাবে কিংবদন্তি নির্মাতা কেনজি মিজোগুচির ওপর বিশেষ রেট্রোস্পেকটিভ প্রদর্শনীও রাখা হয়েছে। এর বাইরেও টিফ এথিক্যাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড, কাশিকো কাওয়াকিতা অ্যাওয়ার্ড ও কুরোসাওয়া আকিরা অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হবে।
উৎসব চলাকালীন জাপানি চলচ্চিত্র পরিচালক ইকেদা আকিরা, মিশিমা ইউকিকো ও ইয়ামামোতো আকিরা মঞ্চে তাঁদের কাজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করবেন। উৎসবের নেভিগেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অভিনেতা ও গায়ক নাকাজিমা কেনতো। প্রোগ্রামিং ডিরেক্টর ইচিয়ামা শোজো জানান, বর্তমান সংকটময় বিশ্বে নির্মাতারা নস্টালজিয়া নয়, বরং ইতিহাসের আলোয় বর্তমানকে বোঝার চেষ্টা করছেন, যা এবারের নির্বাচিত ছবিগুলোতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

















