পাবনার ভাঙ্গুড়া পৌরসভার ঐতিহ্যবাহী শরৎনগর পশুর হাট দীর্ঘকাল ধরে অত্র অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে টিকে আছে। প্রবীণদের মতে, দেশভাগের আগে পাকিস্তান আমলের শুরু থেকেই এই স্থানে পশুর হাট বসত। একসময়ের শনিবারে বসা এই হাটটি বর্তমানে চাহিদার প্রয়োজনে প্রতি সপ্তাহে শনি ও বুধবার দুই দিন বসে। স্থানীয় খামারি এবং দূরদূরান্তের পাইকারদের উপস্থিতিতে হাটটি সবসময় মুখরিত থাকে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কালের পরিক্রমায় হাটটি কেবল একটি সাধারণ বেচাকেনার স্থান নয়; বরং এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের এক প্রাণকেন্দ্র। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই হাটের ঐতিহ্য এবং বর্তমান বাণিজ্যচিত্র যেন গ্রামীণ বাংলার চিরচেনা রূপ পশুর হাটে এখনো বিদ্যমান। হাটের সূচনা নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো সাল পাওয়া না গেলেও, এই এলাকায় পাকিস্তান আমলের আগ থেকেই হাট ছিল। পাবনার শরৎনগর বাজার ও শরৎনগর হাট এলাকার বাণিজ্যিক গুরুত্ব বহু পুরোনো।
এখানকার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী খন্দকার মোহাম্মদ বাচ্চু মণ্ডল জানান, তার বাবা ৫০ বছর আগেও এই ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। শুরুর দিকে বড়াল নদের মাধ্যমে নৌকাযোগে হাটে পশু আসত, তবে নদীপথ মরে যাওয়ায় এখন যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে মিনিট্রাক, নছিমন ও পিকআপ ভ্যানে করে পশু আনা-নেওয়া করা হয়। এই হাটে শুধু গরু নয়, ছাগল, হাঁস-মুরগি, মাছ ও তরি-তরকারির বিশাল সমাহারও লক্ষ্য করা যায়। সপ্তাহের শনিবারে পশুর হাটের পাশাপাশি অন্যান্য দিনে এখানে পাটের হাট ও পণ্যের বাজার বসে। শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও পাইকার ও খামারিরা এখানে পশু কেনাবেচার জন্য ছুটে আসেন। কিন্তু এখন নদী মরা খালে পরিণত হওয়ায় এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ঘটায় নৌকার চলাচল একপ্রকার বন্ধই হয়ে গেছে।
শরৎনগর হাটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর খাবার ব্যবসা। হাটবারে খাবার বিক্রির জন্য এখানে ২০টির বেশি গরু জবাই করা হয়। প্রায় ১৬ বছর ধরে এখানে খাবারের দোকান পরিচালনাকারী মো. সোহেল জানান, হাটে ২০টির মতো খাবারের দোকান রয়েছে। হাটের দিন প্রতিটি দোকানে গড়ে ৬০ থেকে ৭০ কেজি, কখনো কখনো ৮০ থেকে ৯০ কেজি পর্যন্ত গরুর মাংস বিক্রি হয়। ভাত ও গরুর মাংসের এই সমাহার হাটে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের প্রধান চাহিদা। হাটের দীর্ঘদিনের খাবার বিক্রেতা মো. সোহেল বলেন, ‘আমি এই হাটে প্রায় ১৫-১৬ বছর ধরে খাবারের দোকান চালাচ্ছি।
সম্প্রতি হাটে আসা খামারি আবদুল জব্বার জানান, দেশি গরুর প্রতি মানুষের আস্থা ও মাংসের স্বাদের কারণে তিনি দুটি বাছুর সাড়ে ৫৭ হাজার টাকায় কিনেছেন। হাটে দেশি গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার ব্যাপক সমাহার থাকে। ইদানীং মহিষের মাংসের চাহিদা বাড়ায় হাটে মহিষের উপস্থিতিও দেখা যাচ্ছে। মূলত কোরবানির ঈদের সময় এই হাটের পরিধি ও বেচাকেনা বহুগুণ বেড়ে এক উৎসবমুখর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
















