উত্তরাঞ্চলের সাতটি জেলায় গত চার দিন ধরে এলপিজি গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা এবং কুড়িগ্রামের কয়েক শতাধিক পাম্পে পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্যাস মজুত থাকার পরেও মালিকরা তা সরবরাহ করছেন না। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজির দাম বাড়ানোর প্রত্যাশায় এই অসাধু চক্রটি সাধারণ গ্রাহক ও পরিবহন মালিকদের জিম্মি করে ফেলেছে। তাদের এই হটকারী সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছে এলপিজি চালিত মোটরযান মালিক ও ভাড়ায় চালিত গাড়িচালকরা। অনেকে পাম্পে তালা দিয়ে শটকে পড়েছেন। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায় প্রতিটি পাম্পে এলপিজি গ্যাস মজুত রয়েছে। কারণ তারা যেদিন থেকে বলা শুরু করেছে পাম্পে গ্যাস নেই তার আগের দিন গ্যাসের গাড়ি এসে তাদের গ্যাস দিয়ে গেছেন। তারা আরো বলেন, দিনাজপুর দশ মাইল হয়ে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় যাওয়ার পথে হাইওয়ে সড়কের পাশে অবস্থিত সব গ্যাস পাম্পে পর্যাপ্ত গ্যাস রয়েছে, প্রশাসন একটু তদন্ত করলেই পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাসের সন্ধান মিলবে। দাম বাড়লে বাস মালিকরা বেশি টাকা পাবেন আমাদেরকে সুবিধা দেবেন।
ভুক্তভোগী গাড়ি চালক মিজান, মিলন, সাজু ও মোজাফফর জানান, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে তারা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পাম্প মালিকরা হয় ‘গ্যাস নেই’ অথবা ‘মেশিন নষ্ট’—এমন অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন। অথচ বাস্তবে পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুত রয়েছে, যা স্থানীয়দের পর্যবেক্ষণেও স্পষ্ট।
দিনাজপুরের দশমাইল এলাকার গ্যাস পাম্পের প্রতিবেশী ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পাম্পে নিয়মিত গ্যাসের গাড়ি সরবরাহ আসলেও মালিকপক্ষ তা বিক্রি করছে না। তাদের দাবি, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর তদারকি করলে এই সংকট মুহূর্তেই নিরসন সম্ভব। একই চিত্র দেখা গেছে লালমনিরহাটের কাকিনা গ্যাস পাম্পসহ বিভিন্ন স্টেশনে, যেখানে কর্মচারীরা জানান যে মালিকের নির্দেশেই তারা বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।
গোবিন্দগঞ্জের এলপিজি পাম্পকর্মী মুরশিদুল ইসলাম জানান, রাতের বেলা মালিকপক্ষের নির্দেশে তারা গ্রাহকদের গ্যাস নেই বলে জানাচ্ছেন। পাগলাপীর এলাকার মুশফিক ও সোহাগ মিয়ার ভাষ্যমতে, পাম্পমালিকের সিদ্ধান্তের বাইরে কর্মচারীদের কিছু করার নেই, তাই তারা অসহায়। অন্যদিকে, মিঠাপুকুরের হাসনা ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার জগদীশ যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাত দেখালেও, কেন হঠাৎ সব পাম্পে একই সময়ে একই সমস্যা দেখা দিল—এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
সাপ্লাই চেইনের অস্বচ্ছতা নিয়ে বিসমিল্লাহ এলপিজি গ্যাস পাম্পের ম্যানেজার রায়হান কবির বলেন, অতীতে গ্যাসের দাম ধাপে ধাপে বেড়ে ৮৯ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল, বর্তমানে তা ৭৩ টাকা ০৯ পয়সায় নেমেছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নির্ভরশীলতার সুযোগ নিয়ে বড় কোম্পানিগুলো এখন দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে।
বদরগঞ্জের মন্ডলের হাটের পাম্প মালিক আব্দুল ওয়াহেদ জানান, ফ্রেশ, বেক্সিমকো ও যমুনার মতো বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই পাম্প পরিচালনা করার পাশাপাশি অন্য মালিকদের গ্যাস দেয়। তার অভিযোগ, সরবরাহকারীরাই মূলত সিন্ডিকেট করে সরকারকে চাপে ফেলে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে। মূলত তারা বাড়তি দামের আশায় সরকারকে বেকায়দায় ফেলার পায়তারায় লিপ্ত।
রংপুর জেলা জজ কোর্টের এপিপি অ্যাডভোকেট আখতারা ওসমানী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি রাজনৈতিক সিন্ডিকেট ও পাম্প মালিকরা মিলে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য জনগণের পকেট কাটার এই ব্যবস্থা করেছে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপি আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামু বলেন, মজুত থাকা গ্যাস সরবরাহ না করাটা সরকারের প্রতি এক ধরনের ষড়যন্ত্র। তিনি প্রশাসনকে এই সিন্ডিকেট শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানান, প্রশাসন বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও যারা জনগণকে জিম্মি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। সরকার দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর এবং কাউকে জনভোগান্তি সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না।












