যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি থেকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ বোমারু বিমানগুলো প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নিরাপত্তা নিয়ে ‘কিছু হুমকির’ মুখে এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পেন্টাগন গত রোববার বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর মধ্যে অন্তত এক ডজন বি-১ বোমারু বিমান রয়েছে।
নেব্রাস্কার উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রাক্কালে সোমবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, একটি সুনির্দিষ্ট হুমকির খবর পাওয়ার পরই তারা বোমারু বিমানগুলোর অবস্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। এই বিমানগুলো কোনো দুর্ঘটনাবশত স্থান পরিবর্তন করেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, শত্রুকে সুযোগ দেওয়ার চেয়ে তাদের পরাস্ত করাই মূল লক্ষ্য। যদিও হুমকিদাতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেননি তিনি, তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিষয়টিকে ‘বিদেশি শক্তির স্পষ্ট হস্তক্ষেপ’ বলে ইঙ্গিত করেছেন। জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি মনে করি, আমরা তা বলতে পারি। এগুলো তো আর দুর্ঘটনাবশত উড়ে চলে যায়নি।’। ওয়াশিংটন ‘প্রকৃতপক্ষে কারা এ হুমকি দিয়েছে তাদের চেনে’ উল্লেখ করলেও তারা কারা সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানাননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ডাউনিং স্ট্রিটের পক্ষ থেকে অবশ্য আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ দাবি করা হয়েছে। তারা গত সপ্তাহে ঘাঁটিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতার প্রশংসা করেছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঘাঁটির কাছে তিনটি সন্দেহভাজন যান নিয়ে ব্রিটিশ পুলিশের তৎপরতা শুরু হলে বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনার তদন্তে বর্তমানে ব্রিটিশ সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ কাজ করছে। শুরুতে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে জামিনে মুক্তি পান তারা, তবে পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য ও ইরানের দ্বৈত নাগরিকত্বধারী আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। তবে ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্য মার্কিন গণমাধ্যমের সেই খবরগুলোকেই নিশ্চিত করছে, যেখানে বলা হয়েছিল, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ওই বিমানঘাঁটির কাছে তিনটি ‘সন্দেহভাজন যান’ নিয়ে পুলিশ তৎপর হওয়ার পর একটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটে।
ঘটনাটি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর বক্তব্যে কিছুটা ভিন্ন সুর দেখা গেছে। রুবিও মনে করেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সামরিক সরঞ্জাম ও ইউনিট স্থানান্তর নিয়মিত বিষয়, যা সরাসরি কোনো হুমকির সাথে যুক্ত না-ও হতে পারে। তবে ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বিষয়টিকে বাড়তি সতর্কতার অংশ হিসেবে দেখছেন। ভ্যান্সের মতে, ইরান গত ৪৯ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে, এটি তারই ধারাবাহিকতা। তেহরান এ ধরনের যেকোনো অভিযোগ অবশ্য বরাবরের মতোই কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরানের সাথে নতুন করে কোনো সংঘাত শুরু হলে ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির মতো সংবেদনশীল ও ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমানগুলো শত্রুপক্ষের হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারত। হোয়াইট হাউসের এক ঘনিষ্ঠ সূত্র ইউক্রেনে রাশিয়ার ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার উদাহরণ টেনে জানায়, দূরপাল্লার হামলায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র গত বছরের জুনে রাশিয়ার পাঁচটি ঘাঁটিতে ইউক্রেনের চালানো গোপন ড্রোন হামলা বা ‘অপারেশন স্পাইডারওয়েব’-এর উদাহরণ টেনে বলেন, শত্রুপক্ষ দূর থেকেও কতটা বড় ক্ষতি করতে পারে, এটি তারই প্রমাণ।
উল্লেখ্য যে, আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিটি মার্কিন বিমান বাহিনীর জন্য একটি অগ্রবর্তী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ইরান জুলাই মাসে হুমকি দিয়েছিল, তাদের ভূখণ্ডে হামলার জন্য ব্যবহার করা যেকোনো ঘাঁটিকে তারা বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এখান থেকেই বি-১ ও বি-৫২ বোমারু বিমান মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিরক্ষাবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট’-এর বিশ্লেষক ক্রিস্টফ বার্গস রয়টার্সকে জানান, ফেয়ারফোর্ড থেকে বিমান সরিয়ে নেওয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আকাশপথে হামলা চালানোর সক্ষমতা মার্কিন বাহিনীর কিছুটা কমবে। এটি চলমান উত্তেজনার পারদ কিছুটা কমিয়ে আনতে পারে। তবে জ্বালানি নেওয়ার সক্ষমতা বিবেচনা করে এই বিমানগুলোকে হয়তো দিয়েগো গার্সিয়া কিংবা পারস্য উপসাগরের অন্য কোনো ঘাঁটিতে পুনরায় মোতায়েন করা হতে পারে, যা মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু শুধু শুধু আমরা বিমানগুলোকে কেন ওখানে ফেলে রাখব।

















