বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের মৃত্যুহার দিন দিন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের হিসাব বলছে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে অর্থাৎ ২৭৩ দিনে দেশে এসেছে ৪ হাজার ৬০টি মরদেহ। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১৪ জনের মরদেহ দেশে ফিরছে। পরিসংখ্যান বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে ৭০ শতাংশের বেশি মরদেহ আসে, যার শীর্ষে রয়েছে সৌদি আরব। এ বছর শুধু সৌদি আরবেই মারা গেছেন প্রায় ২ হাজার প্রবাসী কর্মী। এর পরেই রয়েছে মালয়েশিয়ার নাম। তবে এসব মৃত্যুর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সনদপত্রে কারণ হিসেবে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ উল্লেখ করা হচ্ছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫১ প্রবাসীর মরদেহ আসে দেশে। ২০২০ সালে এটি কমে হয় ৩ হাজার ১৪০ জন।
প্রবাসে কোনো কর্মীর মৃত্যুর খবর এলে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার মূল দায়িত্ব পালন করে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। বোর্ডের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়ায় একাধিক দপ্তরে অনুমোদন নিতে হয়, যা কখনো কখনো সময়সাপেক্ষ হয়। তবে যেসব দেশে দূতাবাস নেই, সেখানে এই প্রক্রিয়া আরও জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী হয়ে পড়ে। যেমন, কম্বোডিয়ার টাইলস কারখানায় কর্মরত পাবনার আল আমিন গত বছরের ১২ এপ্রিল মারা যান। প্রায় দেড় বছর পর গত ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর মরদেহ দেশে পৌঁছায়। আল আমিনের স্বজন মাসুম খান জানান, ওই দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকায় মরদেহ খুঁজে বের করা থেকে শুরু করে দেশে আনা পর্যন্ত চরম হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তিনি মারা যান ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল। মৃত্যুর খবর পেয়ে ঢাকায় এসে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহায়তায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করে আল আমিনের শ্যালক মাসুম খান। কল্যাণ বোর্ড থেকে আবেদনটি পাঠানো হয় থাইল্যান্ডে। মরদেহ আনতে এমন হয়রানির ঘটনা অহরহ নয়।
অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ যাচাই না করাটা পরিবারের জন্য এক প্রকার অমর্যাদাকর। তাদের মতে, রোগব্যাধি ছাড়াও কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, খুন বা চাপে পড়ে প্রাণহানির অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান জানান, প্রতি বছর মৃতের সংখ্যা বাড়ছে এবং এদের মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী যুবকেরাও রয়েছেন। প্রতিটি মৃত্যুর কারণ নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে মৃত্যুঝুঁকি কমানোর কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। এছাড়া অনিয়মিত কর্মীদের মরদেহ আনার বিষয়েও রাষ্ট্রকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার প্রবাসীদের চিকিৎসাসেবা বাড়ানো ও মৃতদেহ দ্রুত দেশে আনার কার্যক্রমে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। অনিয়মিত কর্মীদের মরদেহ ফিরিয়ে আনা এবং বিদেশে মৃত্যুর কারণ যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে করণীয় ঠিক করার কাজ চলছে। এছাড়া ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, বিএমইটি ছাড়পত্র বা দূতাবাস নিবন্ধন থাকা কর্মীদের মরদেহ আনা ও দাফনের খরচ বোর্ড বহন করে। কোনো নিবন্ধন না থাকলেও আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর প্রথম ৯ মাসে আসা মরদেহের মধ্যে ৬৬ শতাংশের কারণ ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হিসেবে নথিবদ্ধ হয়েছে। বাকি ৩৪ শতাংশের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা বা অন্যান্য কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সড়ক ও কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, আগুন ও ভবন থেকে পড়ে যাওয়ার হার ১৬ শতাংশের বেশি। গত ৫ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১৮ হাজার ১৬৬টি মরদেহ এসেছে, যার ২০ শতাংশেরও বেশি ছিল বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনাজনিত। নোয়াখালীর ফয়েজ আহম্মেদ ও তাঁর ছোট ভাই সুজন আহম্মেদ সৌদি আরবে খেজুর পরিবহনের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান গত ১৬ জুলাই। জুলাই মাসেই তাঁদের মরদেহ দেশে আসে এবং বোর্ড থেকে দাফন বাবদ সহায়তা দেওয়া হয়।
আর্থিক সহায়তা বিতরণের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে মরদেহ দাফনের জন্য ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, আর্থিক অনুদান হিসেবে ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং বিমাসুবিধা হিসেবে ৪৪ কোটি টাকার বেশি বিতরণ করেছে কল্যাণ বোর্ড। এছাড়া দূতাবাসের মাধ্যমে বকেয়া ও ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় ৭৫ কোটি টাকা আদায় করে দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এসব সুবিধা পেতে কর্মীদের স্বজনদের নানা বিড়ম্বনার শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে অনিয়মিত কর্মীরা অনেক ক্ষেত্রে এসব সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। এটি জানতে পেরে তিনি প্রবাসীদের মাধ্যমে দেশটির স্থানীয় পুলিশের নম্বর সংগ্রহ করে কল্যাণ বোর্ডকে সহায়তা করেন।
গবেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অবকাঠামো নির্মাণ খাতে কর্মরত প্রবাসীরা প্রচণ্ড তাপে কাজ করতে গিয়ে দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। অতিরিক্ত তাপমাত্রা কিডনি, হৃদ্রোগ ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা বাড়িয়ে অকালমৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে। বিষয়টির সমাধানে ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, বিএমইটি থেকে প্রদত্ত তিন দিনের প্রশিক্ষণ পর্যাপ্ত নয়। বিদেশগামী কর্মীদের গন্তব্য দেশের কাজের পরিবেশ, জলবায়ু ও সুরক্ষা কৌশল সম্পর্কে আরও গভীর ও কার্যকর প্রশিক্ষণ দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
















