ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)-এর কার্যক্রম নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সাম্প্রতিক আন্দোলন ও অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরব হয়েছেন দেশটির সাবেক ১২৪ জন আমলা ও কূটনীতিক। এক খোলা চিঠিতে তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, নির্বাচনে কারচুপির মতো গুরুতর অভিযোগ তোলার ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে। তাঁদের মতে, কেবল রাজনৈতিক হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে বা জনসমর্থন হারানোর পর প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখতে প্রমাণহীন অভিযোগ তোলা হলে তা দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে দাবি করে এসব সাবেক কর্মকর্তা জানান, ভোট গ্রহণ থেকে শুরু করে ইভিএম সংরক্ষণ এবং ভোট গণনার প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ। বিহারের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের উদাহরণ টেনে তাঁরা বলেন, সেখানে কোনো কেন্দ্রে পুনর্র্নিবাচন ছাড়াই ১৯৫১ সালের পর থেকে রেকর্ড সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি ও নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে নির্বাচন কমিশনের কঠোর নজরদারি ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার কারণে। তাঁরা স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০২৪ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থার পক্ষে রায় প্রদান করেছেন। ভারতের নাগরিকদের উদ্দেশে লেখা এই চিঠি এমন সময়ে এলো, যখন ভোটার তালিকায় অনিয়ম ও ‘ভোট চুরি’র অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে বিরোধীরা। বিহারের নির্বাচনকে উদাহরণ নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নতির উদাহরণ হিসেবে ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনের কথা তুলে ধরেছেন সাবেক আমলা-কূটনীতিকরা। নারীদের ভোটদানের হার ছিল রেকর্ডসংখ্যক।
সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, যদি নির্বাচনে বড় ধরনের কারচুপি করতেই হয়, তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অধীনে কর্মরত হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রতিটি প্রার্থীর নিয়োগকৃত এজেন্টদের নীরব থাকতে হবে, যার কোনো বাস্তব প্রমাণ বা ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। তাঁরা অতীতের সহিংস বা কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনের চিত্র তুলে ধরে জানান, ১৯৮৯ সালের আগের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান স্বচ্ছ ব্যবস্থার আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। বর্তমান পদ্ধতিতে প্রতিটি প্রার্থীর প্রতিনিধিরা ভোটকেন্দ্রে নজরদারি করার সুযোগ পান এবং গণনার সময় যথাযথ হিসাব গ্রহণ করেন। অতীতের নির্বাচনী সহিংসতা ও কারচুপির চিত্র তুলে ধরে তাঁরা বলেন, একসময় ভোটকেন্দ্রে অস্ত্রের ভয় দেখানো, প্রভাবশালীদের লোকজনের দাপট, ব্যালট বাক্স ছিনতাই কিংবা ভুয়া ভোট দেয়া এবং ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়ার ঘটনা ছিল সাধা। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ১৯৮৯ সালে ভোটকেন্দ্র দখলকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে ভারতের সংসদ। ইভিএম এজেন্টদের স্বাক্ষরসহ সিলগালা করে নিরাপদ কক্ষে রাখা হয়, যেখানে প্রার্থীদের প্রতিনিধিরা নজরদারি করতে পারেন।
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে গিয়ে শনিবার দিল্লিতে আটক হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পিনারাই বিজয়ন ও মানিক সরকারসহ বেশ কয়েকজন বিরোধী নেতা। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সাবেক আমলারা বিরোধীদের উদ্দেশে কড়া প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। তাঁরা জানতে চেয়েছেন, অতীতে যে নির্বাচনী ব্যবস্থায় জয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসার সুযোগ পেয়েছেন, এখন কেন সেই একই ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে? তাঁরা কি আসলে পুরো প্রক্রিয়াকে সন্দেহ করছেন, নাকি শুধু পরাজয়ের কারণে ফলাফলকে অস্বীকার করছেন? পাশাপাশি মেশিনে গণনা করা ভোটের সঙ্গে কাগজের স্লিপ মিলিয়ে দেখা হয়।
চিঠিতে সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছে, যখন সহিংসতা ও প্রভাব বিস্তারের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন গণতন্ত্র সুসংহত হয়। কিন্তু ভিত্তিহীন বয়ান তৈরি করে জনগণকে উত্তেজিত করা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেকোনো অভিযোগ প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই না করলে তা কেবল প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিই করে না, বরং পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

















