মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমাগত বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান পূর্ণাঙ্গ ও বহুমাত্রিক যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শত্রুপক্ষের যেকোনো সামরিক আগ্রাসন, হত্যাকাণ্ড কিংবা গুপ্তহত্যার সমুচিত জবাব দিতে ইরান এখন চূড়ান্ত অবস্থানে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সংযম বা সীমাবদ্ধতা দেখানো হবে না বলেও তিনি স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভিকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ওই নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এখন সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। আগ্রাসনকারীদের পাশাপাশি আঞ্চলিক পর্যায়ে তাদের সমর্থক ও লক্ষ্যবস্তুগুলোকেও ইরানের সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করার সক্ষমতা রয়েছে। নতুন করে যেকোনো সামরিক উসকানির কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তথ্যসূত্র: প্রেস টিভি, রয়টার্স ও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
তেহরানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মূলত একটি অভিন্ন শক্তি হিসেবে কাজ করছে। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়া ইসরাইলের পক্ষে ইরানে হামলা চালানো সম্ভব নয়, আবার যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া ইসরাইলও কোনো বড় পদক্ষেপ নিতে পারবে না। তাদের যুদ্ধে যেকোনো এক পক্ষের অংশগ্রহণের ধারণাটিকে তিনি একটি তিক্ত রসিকতা হিসেবে অভিহিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে একই যুদ্ধশক্তি হিসেবে দেখছে তেহরান। তবে এগুলো ইরানি কর্মকর্তার বক্তব্য ও অবস্থান; স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য নয়।
ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে নিয়মিত যেসব প্রকাশ্য হুমকির কথা বলা হচ্ছে, তা ইরানকে নিজেদের আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত ও নৈতিক ভিত্তি প্রদান করেছে। ইতিমধ্যে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান পুনরায় শুরু করার পক্ষে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। অক্টোবরের শুরুতে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ইরানের অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনা এবং নেতৃত্বস্থানীয় লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত করলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনায় দীর্ঘ স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, তেহরান ওয়াশিংটনের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের পাশাপাশি ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করার কৌশলে আলোচনার গতি কমিয়ে দিয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ি গত মঙ্গলবার স্পষ্ট করেছেন যে, ওয়াশিংটন যতক্ষণ পর্যন্ত আস্থা তৈরির মতো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। এর আগে দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে তেহরানের সাতটি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে। তার দাবি, যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে এবং এই অবস্থা থেকে উত্তরণের দায়িত্ব ওয়াশিংটনেরই।
গত জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে সব রণাঙ্গনে যুদ্ধ বন্ধ, ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার এবং বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি ধাপে ধাপে খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। তবে এই সমঝোতা বাস্তবায়নের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এখনো কোনো পক্ষ নিশ্চিত কোনো তথ্য দেয়নি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই হুঁশিয়ারির সবচেয়ে বড় দিক হলো, নতুন করে কোনো সংঘাত শুরু হলে তা কেবল ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনা এবং তাদের মিত্র দেশগুলোও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চরম অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। আগ্রাসনকারীদের স্বার্থ ও লক্ষ্যবস্তু এবং অঞ্চলজুড়ে তাদের সমর্থকদের অবস্থানও ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের আওতায় আসতে পারে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সম্ভাব্য হামলার জবাব শুধু সরাসরি হামলাকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার কথা ভাবছে না ইরান; বরং তাদের আঞ্চলিক স্বার্থ ও সহযোগীদেরও লক্ষ্যবস্তু করার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে দেশটি।
ইরানের এই ঘোষণা থেকে নতুন যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ কম। এটি মূলত সামরিক প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করার কৌশল কিংবা কূটনৈতিক আলোচনায় নিজেদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। বাস্তবে সংঘাতের মাত্রা বাড়ছে কি না, তা বুঝতে সামনের দিনগুলোতে সামরিক তৎপরতা ও কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

















