গাজীপুরের কাপাসিয়ার ঐতিহ্যবাহী ধাঁধার চরের ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর খাসজমি দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছে সাননোভা এনার্জি ওপিসি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। গত ১৬ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক কামাল জামান মোল্লা এই আবেদন করেন। তিনি মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য এবং গত জাতীয় নির্বাচনে মাদারীপুর-১ আসনে দলের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। প্রস্তাবিত জমিতে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। তাদের দাবি, নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের সাথেও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত জমিতে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথা আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদের মিলনস্থল সংলগ্ন দুর্গাপুর ইউনিয়নের রাণীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত এই ধাঁধার চর কাপাসিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। স্থানীয়দের কাছে চরটি কেবল কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের আধার নয়, বরং সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত। পরিবেশকর্মীদের তথ্যমতে, এই চরে ২৫ থেকে ৩০ প্রজাতির পাখির পাশাপাশি বিভিন্ন সরীসৃপ ও দেশীয় উদ্ভিদের আবাস রয়েছে। বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মনির হোসেন জানিয়েছেন, চরে বাণিজ্যিক প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের ভাষ্য, চরের স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা করা জরুরি এবং প্রয়োজনে এটিকে পর্যটন বা প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এর মধ্যে চরের কিছু পুরোনো গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। নদীর বুকের মধ্যে সবুজে ঘেরা এই চরে রয়েছে কৃষিজমি, গাছপালা, ঝোপঝাড় ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি-প্রাণীর আবাস। এখানে স্থানীয় কৃষকেরাও কৃষিকাজ করেন। স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলমগীর বলেন, বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে বিপুল পরিমাণ জমি দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রকল্পের আওতায় চলে যাবে।
প্রস্তাবিত জমি নিয়ে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। জেলা প্রশাসনের নথিপত্র অনুযায়ী, ২৩৯ দশমিক ৫৭ একর জমির মধ্যে ৩০ দশমিক ৯৫ একর নদী, ১৩ দশমিক ৫৩ একর বালুচর, ৪৩ দশমিক ৬ একর সিকস্তি এবং ১৫২ দশমিক ৪৪ একর নাল শ্রেণির জমি। সরকারের অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী, নদী, খাল ও জনগণের ব্যবহার্য শ্রেণির জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। এই আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে আবেদনের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কাপাসিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক। অর্থাৎ মোট জমির প্রায় ৬৩ শতাংশই নাল শ্রেণির।
সাননোভা এনার্জির পরিচালক কামাল জামান মোল্লা অবশ্য দাবি করেছেন, তারা নদীর জমি বা কৃষিজমির জন্য আবেদন করেননি। তার ভাষ্য, ‘চরে স্বয়ংক্রিয় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও রিসোর্ট করার পরিকল্পনা আছে। যেসব খাসজমি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে, কেবল সেগুলোর জন্যই আবেদন করা হয়েছে।’ তবে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভুইয়া জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই চলছে এবং সব নিয়মকানুন বিবেচনায় নিয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে জাতীয় পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে। গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের সংসদ সদস্য মো. সালাহউদ্দিন আইয়ুবী গত ১৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ধাঁধার চরকে বিশেষ পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে, জমি বন্দোবস্তের আবেদনটি এখন কেবল একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রস্তাব নয়, বরং এটি ভূমি আইন, কৃষিজমির সুরক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং চরের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে ধাঁধার চরের জমিগুলোর প্রকৃত শ্রেণি ও বন্দোবস্তযোগ্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

















