খুলনার উপকূলীয় জনপদ কয়রায় প্রযুক্তির ছোঁয়ায় চিরায়ত ডাকসেবার চেনা রূপ এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আজ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে কয়রার ডাকসেবার এই বিবর্তন নিয়ে কথা বলেছেন স্থানীয় গ্রাহক ও কর্মকর্তারা। একসময় যেখানে ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার আওয়াজে মানুষ প্রিয়জনের চিঠির আশায় উন্মুখ হয়ে থাকত, সেই দিন এখন অতীত। ব্যক্তিগত চিঠির আদান-প্রদান প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও পার্সেল, রেজিস্ট্রি ডাক, জরুরি প্রাতিষ্ঠানিক কাগজপত্র এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে ডাকঘরগুলো আজও তাদের কার্যকারিতা ধরে রেখেছে। একসময় ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই ঘরের দরজায় ছুটে যেতেন পরিবারের সদস্যরা। কারও হাতে আসত দূরদেশে থাকা সন্তানের চিঠি, কারও হাতে প্রিয়জনের খবর।
কয়রা উপজেলার ৮০ বছর বয়সী প্রবীণ বাসিন্দা সফেদ আলী নিজের শৈশব ও যৌবনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আগে ডাক বিভাগের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিঠি বিলি করতেন। সেই চিঠি পাওয়ার পর পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে তা পড়ত এবং আত্মীয়-স্বজনদের খবরাখবর জানত। বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে মুহূর্তেই যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে, ফলে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগের সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার এখন আর প্রয়োজন হয় না। কয়রার ৮০ বছর বয়সী বাসিন্দা সফেদ আলীর স্মৃতিতে এখনও জীবন্ত সেই দিনগুলো। দূর – দূরান্তের আত্মীয় – স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মানুষ নিয়মিত চিঠি পাঠাতেন।
যোগাযোগ ব্যবস্থার এই আমূল পরিবর্তনের ফলেই মূলত ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার তলানিতে ঠেকেছে। তবে ব্যক্তিগত চিঠি কমলেও সামগ্রিক ডাকসেবা বন্ধ হয়ে যায়নি। ই-কমার্স তথা অনলাইন কেনাকাটা বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্য পরিবহনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি নানা দাপ্তরিক নথিপত্র এবং জরুরি মালামাল আদান-প্রদানে কয়রাবাসীর কাছে ডাকঘর এখনো অন্যতম প্রধান বিশ্বস্ত মাধ্যম। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় সবখানে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা না থাকায় ডাকব্যবস্থার গুরুত্ব এখনো অপরিসীম। একটি চিঠিকে ঘিরেই তৈরি হতো অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা আর আনন্দের মুহূর্ত।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ডাকঘরকে কেবল অতীত স্মৃতির প্রতীক হিসেবে আটকে না রেখে আধুনিক যুগের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। সেবার মান বাড়ানো এবং দ্রুততম সময়ে তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রযুক্তির আরও সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন। চিঠির খামে আবেগ কমে গেলেও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রমের মাধ্যমে কয়রার পোস্ট অফিসগুলো মানুষের আধুনিক চাহিদা মেটাতে সচেষ্ট রয়েছে। দিবসটিকে সামনে রেখে কয়রার ডাকসেবার বর্তমান চিত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় ডাকব্যবস্থার চেহারা বদলেছে; কিন্তু প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। বরং মানুষের প্রয়োজনের ধরন বদলানোর সঙ্গে ডাকঘরও খুঁজছে নতুন ভূমিকা।
কয়রা উপজেলা পোস্টমাস্টার সৈয়দ মিজানুর রহমান জানান, যুগের পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ডাকসেবাতেও আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। প্রথাগত সেবার পাশাপাশি এখন প্রযুক্তিভিত্তিক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে চালু হওয়া ‘স্পিড পোস্ট’ সেবার আওতায় অত্যন্ত সাশ্রয়ী খরচে যেকোনো ধরনের পণ্য বা মালামাল মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এই দ্রুত ও আধুনিক সেবার কারণেই মানুষ আবারও পোস্ট অফিসের প্রতি আস্থা রাখছেন এবং সেবা নিতে আসছেন। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে দেখেছি, চিঠি বিলি করতে পোস্ট অফিসের লোকজন বাড়িতে আসতেন।

















