সংবিধান সংশোধন বিষয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে দেশের শীর্ষ স্থানীয় প্রায় ৫০ জন সম্পাদক ও প্রবীণ সাংবাদিকের এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় সংসদের ক্যাবিনেট কক্ষে রোববার দুপুর আড়াইটা থেকে টানা দুই ঘণ্টা ধরে চলা এই সভায় সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি উঠে এসেছে। সভার পর বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, সংবিধানে বড় ধরনের কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনা হলে সাংবিধানিক নিয়ম মেনে পুনরায় গণভোট বা রেফারেন্ডাম আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিক গণভোট আমাদের সংবিধানে আর্টিকেল ১৪২-তে ছিল।
কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ গণভোটের ধরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান, সাংবিধানিক গণভোট ও সাধারণ আইনি গণভোটের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়েছিল, তা ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে পুনর্বহাল হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে কোনো মৌলিক পরিবর্তন গণভোটের জন্য পাঠানো সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার অংশ। এছাড়া বিএনপির পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাবের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের কোনো সরকার যাতে সহজে এটি বাতিল করতে না পারে, সেজন্য সংবিধানে বিষয়টি কঠোরভাবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। বাট, এটা ৫ই আগস্টের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পরে সুপ্রিম কোর্টে একটা ভার্ডিক্ট হয়েছে ফিফটিনথ অ্যামেন্ডমেন্ট যেটা রিপিল করার জন্য চ্যালেঞ্জ করে যে রিটটা হয়েছে সেখানে জাজমেন্ট এসেছে যে আর্টিকেল ১৪২-এর যে গণভোট সেটা পুনর্বহাল ক। আওয়ামী লীগের সময় পঞ্চদশ সংশোধনীতে সেটা উড়িয়ে দিয়েছে। এই আইন সভায় গ্রহণ করতে হবে, এরপরে সেটা কনস্টিটিউশনে প্রপারলি আসবে।
দৈনিক দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি সাংবাদিকদের জানান, সভায় অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকরা জোর দিয়েছেন যেন যেকোনো সংশোধনী জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সম্পন্ন করা হয়। বিশেষ কমিটি আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসে সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবটি উত্থাপন ও পাশের বিষয়ে আশাবাদী। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য আনার উদ্যোগের বিষয়ে মুস্তাফিজ শফি বলেন, অতীতে প্রধানমন্ত্রীকে যে অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল তা দেশের জন্য কল্যাণকর হয়নি। তাই এই দুই পদের ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি নিয়োগে বৈষম্য দূর করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারা বিরোধী দলের সদস্যদের বারবার কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, আলোচনার মাধ্যমেই সব মতভেদ নিরসন সম্ভব। সাংবাদিকরা এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিরোধী দল এখন না এলেও সংসদ অধিবেশনে বিলটি তোলার সময় তাদের সহযোগিতা পাওয়া যাবে বলে তারা আশা করছেন। বিরোধী দলের জন্য এখনো পাঁচটি আসন খালি রাখা হয়েছে এবং তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ উন্মুক্ত রয়েছে।
সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের সময় অনুষ্ঠিত ‘হ্যাঁ/না’ ভোট প্রসঙ্গে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে কমিটি জানায়, ওই গণভোটটি মূলত একটি প্রক্রিয়াগত ধাপ ছিল। সরকার যদিও ওই গণভোটের অধ্যাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পাস করেনি, তবুও গণভোটের মূল চেতনা ও সংবিধান সংশোধনের বিষয়গুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করতে চায়। বৈঠকে কমিটির সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ছাড়াও জয়নুল আবেদীন, মোঃ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন। কোন বিষয়ে আইন প্রণীত হলো, সেই হিসেবে জনগণের গণভোটের আহ্বান করা যায়।
সবশেষে, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে জনমতের প্রতিফলন ঘটানোই কমিটির মূল লক্ষ্য বলে জানানো হয়। সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সম্পাদকরা এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই নতুন বাংলাদেশের সংবিধানে সংস্কারগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে কমিটির পক্ষ থেকে পুনরায় আশ্বস্ত করা হয়েছে।

















