ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের লাগাতার হামলার শিকার সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনা। অথচ গত মাসে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে মক্কায় স্বাক্ষরিত নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির পর এখনো কোনো যৌথ সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এই নীরবতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে—তবে কি মক্কা জোট শুরুতেই ব্যর্থ?
বিশেষজ্ঞরা চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই জানতে চাইছেন, হুথিদের যেকোনো হামলায় তুরস্ক বা পাকিস্তান কি তাৎক্ষণিকভাবে রিয়াদের সহায়তায় এগিয়ে আসবে? সম্প্রতি বাব আল-মান্দাব প্রণালির উপকূলে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার পর এই বিতর্ক আরও বেড়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ এই পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়, যা পরিস্থিতির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে কেবল ‘জোট ব্যর্থ হয়েছে’ বলে এই অবস্থাকে সংজ্ঞায়িত করা ঠিক হবে না। এর পেছনে তিনটি মৌলিক কারণ রয়েছে: প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতার আইনি কার্যকারিতা, জোটের প্রয়োজনীয় কাঠামোগত প্রস্তুতি এবং সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক সংহতি। মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুরস্কের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, চুক্তিটি ব্যর্থ বলে সমালোচনা করার পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। এর মাধ্যমে জোটটির গুরুত্ব খাটো করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তার দাবি।
প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত আইনি বাধ্যবাধকতাগুলো এখনো কার্যকর হয়নি। তুরস্কের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো নিরাপত্তা চুক্তি কার্যকর করতে পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। দেশটি শিগগিরই এই চুক্তি পার্লামেন্টে উপস্থাপন করবে, যেখানে আগামী অক্টোবরে এর পাঠ প্রকাশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাকিস্তানকেও একই পথ অনুসরণ করতে হবে। একমাত্র সৌদি আরব রাজকীয় ডিক্রির মাধ্যমে তা দ্রুত অনুমোদন করতে সক্ষম। তাই চুক্তির আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই তুরস্ককে সামরিক সহায়তায় ব্যর্থ বলার বিষয়টি আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
মক্কা চুক্তি কেবল একটি সাধারণ নিরাপত্তা সমঝোতা নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার আদলে কাঠামো তৈরির উদ্যোগ। তুর্কি কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, চুক্তি বাস্তবায়নের পর তিন দেশকে হুমকি মোকাবিলায় কৌশল নির্ধারণ, পারস্পরিক পরামর্শ এবং সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বা ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ নিশ্চিত করতে হবে। এরই মধ্যে গত ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে তিন দেশ একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একমত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে একজন পাকিস্তানি মহাসচিব তিন বছরের মেয়াদে এই সচিবালয়ের নেতৃত্ব দেবেন। এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মক্কা চুক্তির সাথে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের তুলনা করা হলেও, এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি হামলায় স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধ শুরু হবে। ন্যাটোর ক্ষেত্রেও কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরা সহায়তা করতে বাধ্য থাকলেও, প্রতিক্রিয়ার ধরণটি প্রতিটি দেশ নিজেরা নির্ধারণ করে। মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রেও কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা চাইবে এবং পরবর্তীতে তিন দেশ বৈঠকে বসে করণীয় ঠিক করবে।
সৌদি আরবে হুতি হামলার পর পাকিস্তান ও তুরস্ক উভয় দেশই এর নিন্দা জানিয়েছে। পাকিস্তান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, রিয়াদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকলেও এখন পর্যন্ত তাদের কাছে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ আসেনি। তুর্কি কর্মকর্তা ন্যাটোর উদাহরণ টেনে বলেন, ২০১৫ সালে রুশ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার পর তুরস্ককে ন্যাটো আকাশ ও নৌ সক্ষমতা দিয়ে সহায়তা করেছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে রুশ ড্রোনের অনুপ্রবেশের ঘটনায় তারা সব সময় সামরিক পাল্টা ব্যবস্থা নেয়নি।
পরিশেষে, মক্কা চুক্তির মূল উদ্দেশ্য কোনো চলমান সংঘাতে তাৎক্ষণিক সামরিক সমাধান দেওয়া নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদে এমন একটি প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলা, যাতে শত্রুরা হামলার আগে সতর্ক হতে বাধ্য হয়। সৌদি আরবে হুতি হামলার পর যৌথ সামরিক অভিযান না হওয়াকে এককভাবে জোটের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা সংগত নয়, কারণ আইনি অনুমোদন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পূর্ণতা পেতে এখনো সময়ের প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর সঙ্গে অন্তত তিনটি পৃথক বিষয় জড়িত: প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা আদৌ কার্যকর হয়েছে কি না, সেগুলো বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান ও সামরিক কাঠামো তৈরি হয়েছে কি না এবং সদস্যদেশগুলো রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট সংহতি দেখাচ্ছে কি না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শুধু চুক্তি নয়, দরকার সামরিক প্রস্তুতিও। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ ছাড়া সামরিক সক্ষমতা ও সহযোগিতা বাড়াতে যৌথ কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়েও দেশগুলো সম্মত হয়েছে। চাকরির আরও তথ্য: তুর্কি কর্মকর্তা বলেন, সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, মহাসচিব নিয়োগ এবং নিয়মিত প্রতিরক্ষা আলোচনা আয়োজনের সিদ্ধান্ত জোটকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পথে অগ্রগতির প্রমাণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মক্কা চুক্তিতে একটি সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার প্রতিশ্রুতি থাকায় এর সঙ্গে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের তুলনা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০১৫ সালের নভেম্বরে তুরস্ক রুশ একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে দাবি করেছিল যে বিমানটি তুরস্কের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরপর আঙ্কারা ন্যাটোর জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছিল।













