ময়মনসিংহের আকুয়া বাইপাস মোড়ে রাজিব পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারানো সাতজনের মরদেহ শুক্রবার রাতে জামালপুরে পৌঁছানোর পর সেখানে শোকের মাতম শুরু হয়। রানাগাছা ও শরিফপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের বাতাস কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত পৃথক স্থানে জানাজা শেষে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে প্রতিটি বাড়িতে তৈরি হয় শোকাবহ পরিবেশ। অনেকেই শেষবারের মতো স্বজনদের মুখ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। রেখে গেছে স্বজনদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
এর আগে, শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিহতদের নিজ নিজ এলাকায় নিয়ে আসা হয়।
রানাগাছা ইউনিয়নের দড়ি হামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের মোফাজ্জল হোসেন লেবু (৫৫), তার মা রশিদা বেগম (৮৫), লেবুর মেয়ে মর্জিনা বেগম (২৫) এবং মর্জিনার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মিলান—এই চারজন একই পরিবারের সদস্য ছিলেন। মোফাজ্জল হোসেন ও তার মা রশিদা বেগমের জানাজা নিজ বাড়িতে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। এছাড়া মর্জিনা বেগম ও তার শিশু সন্তান মিলানকে রানাগাছার ঘোড়ার কান্দা গ্রামে শ্বশুরবাড়ির এলাকায় পাশাপাশি কবরস্থ করা হয়। এই একই পরিবারের চার সদস্যকে হারিয়ে এলাকাটিতে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। একই পরিবারের চারজনকে হারানোর ঘটনায় গোটা গ্রাম যেন শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়।
একই দুর্ঘটনায় নিহত সিএনজি চালক সুজন মিয়ার বাড়িও রানাগাছা ইউনিয়নের বীর গোবিন্দি গ্রামে। শুক্রবার রাতেই তার বাড়িতে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।
শরিফপুর ইউনিয়নের বাদেচাঁন্দি গ্রামের বাসিন্দা আকরাম হোসেন (৪৯) ও তার স্ত্রী মমতা বেগমও (৩৯) এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। স্থানীয়রা জানান, আকরাম নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং তার স্ত্রী মমতা ভালুকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। প্রায় এক মাস আগে তারা বাড়িতে এসেছিলেন। নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে ফেরার পথেই শুক্রবার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া বাইপাস মোড়ে তাদের অটোরিকশাকে চাপা দেয় রাজিব পরিবহনের বাসটি। তাদের দুই সন্তান রয়েছে। বাদেচাঁন্দি সামাজিক কবরস্থানে স্বামী-স্ত্রীর শেষ শয্যা নিশ্চিত করা হয়।
নিহতদের শেষ বিদায়ে স্থানীয়দের মাঝে চাপা ক্ষোভ দেখা গেছে। জানাজায় অংশ নেওয়া এলাকাবাসী জামালপুর-ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কে রাজিব পরিবহনের বাসের বেপরোয়া চলাচল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা মহাসড়কে চালকদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা, ফিটনেস পরীক্ষা জোরদার করা এবং ট্রাফিক তদারকি বাড়ানোর দাবি জানান।
জানাজায় উপস্থিত হয়ে জামালপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট ওয়ারেছ আলী মামুন শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, নিহতদের পরিবারকে জেলা প্রশাসন ও পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। এছাড়া মহাসড়কে বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ ও দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে তিনি আশ্বাস দেন। একটি সড়ক দুর্ঘটনা একসঙ্গে নিভিয়ে দিয়েছে সাতটি প্রাণ। বেপোরোয়া গতিতে বাস চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও মৃত্যুর মিছিল বন্ধের চেষ্টা করা হবো বলে জানান তিনি।
দুর্ঘটনার পর পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দুর্ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছিল। এখন স্থানীয়দের প্রশ্ন, বারবার এমন প্রাণহানির পরও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাযথ ও স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের আর কতটুকু সময় প্রয়োজন? এই প্রশ্ন ও শোক নিয়েই জামালপুরের জনপদ এখন স্তব্ধ। তাদের দাবি, প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

















