১৯৮৯ সালে ঐতিহাসিক বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলার মাধ্যমে জার্মানির দীর্ঘদিনের বিভাজন অবসানের ঐতিহাসিক পথ তৈরি হয়েছিল। এর পর ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর বার্লিনের বুন্দেসটাগ বা রাইখস্টাগ ভবনের সামনে এক আনন্দঘন উৎসবের মধ্য দিয়ে সাবেক পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরেকত্রীকরণের ঘোষণা দেয়। তবে এই মিলনের ৩৬ বছর পূর্তির লগ্নে দাঁড়িয়ে শুধু উৎসবের আবহে সীমাবদ্ধ নেই দেশটি। দীর্ঘ সময় পর এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, পুনরেকত্রীকরণের সেই সন্ধিক্ষণে যে গভীর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা আজকের বাস্তবতায় কতটা সুদৃঢ় ভিত্তি পাচ্ছে। ৩৬ বছর আগে পুনরেকত্রীকরণের পর পূর্ব জার্মানির মানুষের কাছে পশ্চিমের মতো সমৃদ্ধির যে প্রতিশ্রুতি তৈরি হয়েছিল, বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে কঠিন ছিল। তবে এবার শুধু উৎসব নয়, আলোচনায় উঠে আসছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—পুনরেকত্রীকরণের মাধ্যমে যে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেগুলো আজ কতটা নিরাপদ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে প্রায় ৪১ বছর ধরে অর্থাৎ ১৯৪৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে গড়ে উঠেছিল পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ব্লকের পতনের পর যখন দুই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক মিলন ঘটে, তখন পূর্ব জার্মানির বাসিন্দারা এক নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পাশাপাশি পশ্চিমা ধাঁচের বিপুল সমৃদ্ধির প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ চার দশকের দুটি ভিন্ন জীবনযাত্রাকে রাতারাতি এক করে ফেলা মোটেও সহজ ছিল না। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রবেশের রূপান্তর পর্বে বহু পূর্ব জার্মান শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ব্যাপক বেকারত্বের মুখে পড়েন সেখানকার মানুষ। একসময় একটি দেয়াল জার্মানিকে দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে পূর্ব জার্মানিতেও সেই আন্দোলনের ঢেউ এসে লেগেছিল। তখন সবাই বিশ্বাস করেছিল, পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান এবং পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিস্তারের সঙ্গে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনেরও স্থায়ী বিজয় ঘটবে। কিন্তু তিন দশকের বেশি সময় পর সেই আশাবাদে ভাটা পড়েছে।
সে সময় পূর্ব জার্মানির সরকারি সম্পদ ও কলকারখানা বেসরকারীকরণের লক্ষ্যে গঠিত প্রতিষ্ঠান ‘ট্রইহ্যান্ডআনস্টাল্ট’ দ্রুতই ব্যাপক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তৎকালীন সেই অর্থনৈতিক ধস এবং মানসিক আঘাতের রেশ আজও পূর্ব জার্মানির মানুষের মাঝে পুরোপুরি কেটে যায়নি। তবে আজকের পরিবর্তিত বাস্তবতায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক এই পিছিয়ে পড়ার চিত্র শুধু পূর্বাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পশ্চিম জার্মানির অনেক এলাকাতেও এখন একই ধরনের বঞ্চনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিগত দুই দশকে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা দুর্যোগের মধ্য দিয়ে গেছে জার্মান সমাজ ব্যবস্থা। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলা, ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, ২০০৭-০৮ সালের তীব্র বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান, তীব্রতর হতে থাকা জলবায়ু সংকট, করোনাভাইরাস মহামারি এবং অভিবাসন নীতি নিয়ে ক্রমাগত অভ্যন্তরীণ বিতর্ক ও যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের উত্থান—সব মিলিয়ে দেশটির স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় তীব্র অনিশ্চয়তা বয়ে এনেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হওয়ায় প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমান্বয়ে কমছে, যার সুযোগ নিচ্ছে উগ্র ডানপন্থী শক্তিগুলো।
একসময় মনে করা হতো উগ্র ডানপন্থার প্রসার কেবল পূর্ব জার্মানির সাবেক সমাজতান্ত্রিক অঞ্চলের সমস্যা, কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড বা এএফডির মতো অভিবাসীবিরোধী কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর শক্তিশালী অবস্থান পশ্চিম জার্মানির রাজ্যগুলোতেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে এই উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রবণতাকে শুধুমাত্র পূর্ব জার্মানির ইতিহাসের আলোকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি তীব্র ক্ষোভই সাধারণ ভোটারদের এ ধরনের দলগুলোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলেও ইদানীং উগ্র ডানপন্থা উল্লেখযোগ্যভাবে জনপ্রিয় হচ্ছে।
জার্মানির সামগ্রিক ঐক্যের ইতিহাসকে তাই শুধু ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবরের একটি বিশেষ তারিখ দিয়ে পরিমাপ করা চলে না। এটি একাধারে অভাবনীয় সাফল্য, অপরিসীম আকাঙ্ক্ষা, ভুল সিদ্ধান্ত থেকে জন্ম নেওয়া গভীর হতাশা এবং প্রতিনিয়ত নিজেদের আত্মমূল্যায়নের এক জটিল পথ। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে জার্মানির এই ৩৬ বছরের ইতিহাস আসলে একই সঙ্গে অর্জনের আনন্দ এবং নতুন জটিলতা ও অস্বস্তি কাটিয়ে ওঠার এক কঠোর লড়াইয়ের গল্প।
ঐতিহাসিক এই পুনরেকত্রীকরণ দিবসকে সামনে রেখে এ বছর কেন্দ্রীয় আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে উত্তর জার্মানির বিখ্যাত বন্দর নগরী ব্রেমেন। ২ থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ব্রেমেন শহরে জমকালো নানা কর্মসূচি পালিত হবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিতর্ক, বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং নাগরিক সম্মিলনে মুখরিত হয়ে উঠবে এই উৎসব। এবারের উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সম্মিলিত শক্তি, একটি দেশ’।

















