ক্রীড়া প্রতিবেদক:
ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রশ্ন ও বিতর্ক চলছিল, তা নতুন মাত্রা পেয়েছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে। তদন্তে উঠে এসেছে, তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নির্দেশনার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) ভবনে সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়।
ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই ক্রিকেটাঙ্গনে নানা প্রশ্ন ছিল। নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ দলকে ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটার ও কোচদের কয়েকজনের বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তাদের ভাষ্য ছিল, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার জন্য ক্রিকেটাররা প্রস্তুত ছিলেন।
ওই সময় দেশের দায়িত্বে ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন আসিফ নজরুল। অন্যদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ায় দেশের ক্রিকেটীয় ভাবমূর্তি, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পরবর্তীতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আমিনুল হক বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অংশ না নেওয়ার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি (অ্যাডমিন) একেএম ওয়ালিউল্লাহ, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দাস্তগীরকে নিয়ে গঠিত কমিটি কয়েক মাস ধরে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে।
মঙ্গলবার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন কমিটির সদস্যরা। একেএম ওয়ালিউল্লাহ জানান, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে বিসিবির কাছে চিঠি পাঠিয়ে ভারত সফর না করার বিষয়টি জানানো হয়েছিল। যেহেতু ওই সময় ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন আসিফ নজরুল, তাই তার নির্দেশের ভিত্তিতেই চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল বলে তদন্ত কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।
তদন্ত কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, বিসিবি সরকারি ওই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করেই বিশ্বকাপে দল পাঠানোর প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কমিটির সদস্যদের মতে, বিভিন্ন দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের ওই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া উচিত ছিল। ফলে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তকে যথার্থ মনে করেনি তদন্ত কমিটি।
তবে তদন্তের সময় তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং বিসিবির তৎকালীন সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে কমিটি। তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাক্ষাৎ বা সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তদন্ত কমিটি যোগাযোগ করেনি বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
তদন্ত কমিটি সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করার পরিবর্তে ভবিষ্যতের জন্য বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—বাংলাদেশ ক্রিকেটকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং বিসিবিকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও স্বাধীনতা দেওয়া।
কমিটির মতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ক্রিকেটীয় বাস্তবতা, খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের পর ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আবারও ক্রিকেটাঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, ক্রিকেটাররা প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও কেন শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারেনি—তদন্ত প্রতিবেদনের পর সেই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।













