মতামত: জাহিদ ইকবাল:-
বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন হয়, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলায়, মন্ত্রী-সচিবের দায়িত্বে পরিবর্তন আসে। রাজনৈতিক স্লোগান পাল্টায়, নির্বাচনী পোস্টারে নতুন মুখ দেখা যায়। কিন্তু এই পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পড়ে? প্রশ্নটি এখন কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকারিতা ও জনআস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
একটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মানুষের প্রত্যাশা বাড়ে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসবে, প্রশাসনিক হয়রানি কমবে, ঘুষের প্রবণতা হ্রাস পাবে, হাসপাতালগুলোতে সেবা উন্নত হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো হবে এবং বিচারপ্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে—এমন আশা তৈরি হয়। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলে অনেক নাগরিক আবারও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন।
তখন প্রশ্ন ওঠে, ক্ষমতার পরিবর্তন কি রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে পেরেছে?
চেয়ার বদল নয়, প্রয়োজন ব্যবস্থার পরিবর্তন
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কার, জবাবদিহি ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিষয়ে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর নতুন প্রত্যাশার জন্ম দেয়।
তবে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কৃতি বদলে যায় না। কোনো মন্ত্রী বদলি হতে পারেন, সচিবের দায়িত্ব পরিবর্তন হতে পারে, রাজনৈতিক নেতৃত্বে নতুন মুখ আসতে পারে। কিন্তু নাগরিকসেবা প্রদানের পুরোনো পদ্ধতি, ফাইল আটকে রাখার প্রবণতা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিশেষ সুবিধা এবং জবাবদিহির ঘাটতি যদি থেকে যায়, তাহলে পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না।
রাষ্ট্রের কার্যকারিতা নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মতান্ত্রিক পরিচালনা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর। ব্যক্তির পরিবর্তনের পাশাপাশি সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের পদ্ধতিতেও সংস্কার প্রয়োজন।
জবাবদিহি ছাড়া দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন
দুর্নীতি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক সমস্যা নয়। প্রশাসনিক দুর্বলতা, অনিয়মের সুযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং শাস্তির অনিশ্চয়তা—এসব বিষয় দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখতে পারে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া সহজ হলেও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে এমন কাঠামো পরিবর্তন করা অনেক বেশি কঠিন। তাই কেবল কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, তা দিয়ে দুর্নীতিবিরোধী সাফল্য মূল্যায়ন না করে দেখতে হবে—সরকারি সেবায় অনিয়মের সুযোগ কতটা কমেছে, তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা জবাবদিহির আওতায় এসেছে।
নাগরিককে সরকারি সেবা পেতে পরিচিত ব্যক্তির সাহায্য নিতে হবে কেন? একটি সাধারণ অনুমোদন বা সনদের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হবে কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
অর্থনীতির হিসাব আর সংসারের হিসাব এক নয়
দেশের অর্থনৈতিক সূচক উন্নত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে অর্থনীতির সামগ্রিক পরিসংখ্যানের পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় ও আয় পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।
মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও যদি খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় সাধারণ মানুষের আয়কে চাপে ফেলে, তাহলে অর্থনৈতিক স্বস্তি সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না।
একজন নিম্ন বা মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অর্থ খুবই বাস্তব—বাজারের খরচ সামলাতে পারা, পরিবারের প্রয়োজন মেটানো, সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় বহন করা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা নিশ্চয়তা পাওয়া।
তাই অর্থনৈতিক সাফল্যের মূল্যায়নে প্রবৃদ্ধি ও অন্যান্য সূচকের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, মজুরি এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেতে হবে।
উন্নয়ন মানে শুধু বড় প্রকল্প নয়
বাংলাদেশে অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল সেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের প্রকৃত সুফল নির্ভর করে তা মানুষের জীবনকে কতটা সহজ ও নিরাপদ করছে তার ওপর।
একটি রাস্তা নির্মাণের পর যদি পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকে, নতুন ভবনে যদি অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, অথবা সড়ক প্রশস্ত করার পর পথচারীদের চলাচলের সুযোগ সংকুচিত হয়, তাহলে উন্নয়ন পরিকল্পনার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
নগরবাসীর কাছে উন্নয়ন মানে শুধু উড়ালসড়ক বা বড় অবকাঠামো নয়। বৃষ্টির পর জলাবদ্ধতা কমা, পরিষ্কার ড্রেন, নিরাপদ ফুটপাত, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, নিরবচ্ছিন্ন পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া—এসবই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে উন্নয়নের ব্যয় বাড়তে পারে, অথচ নাগরিক সুবিধা প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায় না।
স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জরুরি
ডেঙ্গু, হামসহ সংক্রামক রোগের বিস্তার স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। রোগী হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসা দেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি রোগ প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ ছিটানো বা প্রচারমূলক কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, জমে থাকা পানি অপসারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি জরুরি।
স্বাস্থ্যখাতে কার্যকর ব্যবস্থাপনা বলতে বোঝায়—প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ, পর্যাপ্ত চিকিৎসা উপকরণ এবং সবার জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা।
রাষ্ট্রের সক্ষমতা তখনই দৃশ্যমান হয়, যখন সংকট তৈরি হওয়ার আগেই তা মোকাবিলার প্রস্তুতি থাকে।
ডিজিটাল সেবা নাগরিকের সময় বাঁচাচ্ছে কি?
ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রশাসনিক সেবা সহজ করার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু অনলাইন ব্যবস্থা চালু করলেই নাগরিক হয়রানি দূর হয় না।
একটি সনদ পেতে যদি নাগরিককে বারবার অফিসে যেতে হয়, অনলাইনে আবেদন করার পরও যদি অপ্রয়োজনীয় ধাপ পেরোতে হয়, অথবা অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা থাকে, তাহলে প্রযুক্তির ব্যবহার তার পূর্ণ সুফল দিতে পারছে না।
ডিজিটাল সেবার সাফল্য পরিমাপ করতে হবে নাগরিকের সময়, ব্যয় ও ভোগান্তি কতটা কমেছে তার ভিত্তিতে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, নির্ধারিত সময়সীমা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন
নাগরিকের দৈনন্দিন সমস্যার বড় অংশ স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হয় এবং সেখানেই তার সমাধান প্রয়োজন।
রাস্তা সংস্কার, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা ও স্থানীয় জনসেবার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত। এসব সমস্যা সমাধানে শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়।
স্থানীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, অর্থায়ন, দক্ষতা ও জবাবদিহির কাঠামো দিতে হবে। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত নজরদারি থাকলে জনসেবার মান উন্নত করার সুযোগ বাড়ে।
রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিকেরও দায়িত্ব আছে
রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রশ্নে নাগরিকের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ফুটপাত দখল, যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা, আইন ভাঙার চেষ্টা কিংবা অনিয়মকে ব্যক্তিগত সুবিধার কারণে মেনে নেওয়া—এসব আচরণও সামাজিক সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়।
তবে নাগরিকের দায়িত্বের কথা বলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যায় না। রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয় এবং সৎভাবে চলা মানুষের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা থাকে।
একটি দায়িত্বশীল সমাজ গঠনে নাগরিক সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি—দুটিই প্রয়োজন।
জনগণের প্রত্যাশা খুব সাধারণ
নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা রাতারাতি কোনো অলৌকিক পরিবর্তন নয়। তারা চায় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম অনুযায়ী কাজ করুক।
একজন রোগী হাসপাতালে গিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাক। একজন কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ পান। একজন শ্রমিক সময়মতো মজুরি পান। একজন শিক্ষার্থী ন্যায্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সুযোগ লাভ করেন। একজন ব্যবসায়ী অপ্রয়োজনীয় হয়রানি ছাড়া অনুমোদন পান। একজন নাগরিক থানায় গিয়ে আইনি সহায়তার আশা করতে পারেন।
এই প্রত্যাশাগুলো বড় কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এগুলো নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত মৌলিক প্রয়োজন।
শেষ কথা: পরিবর্তনের মাপকাঠি কোথায়?
সরকার পরিবর্তন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু একটি সরকারের সাফল্য শুধু ক্ষমতা গ্রহণ, রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা বড় প্রকল্পের সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না।
প্রশ্ন হওয়া উচিত—সরকারি সেবা কি সহজ হয়েছে? দুর্নীতির সুযোগ কি কমেছে? আইন প্রয়োগে ন্যায্যতা কি বেড়েছে? মানুষের আয় ও জীবনযাত্রায় কি স্বস্তি এসেছে? প্রতিষ্ঠানগুলো কি আগের চেয়ে বেশি জবাবদিহির মধ্যে এসেছে?
ক্ষমতার কেন্দ্রে মুখ বদলালেই রাষ্ট্রের সংস্কৃতি বদলে যায় না। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক সংস্কার, নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি।
বাংলাদেশের নাগরিকেরা এমন একটি রাষ্ট্র প্রত্যাশা করেন, যেখানে সরকার পরিবর্তনের সুফল কেবল ক্ষমতার কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও তার প্রতিফলন দেখা যাবে।
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কার্যকারিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি থেকেই যায়—
সাধারণ মানুষ কি আগের তুলনায় একটু বেশি নিরাপদ, স্বস্তিতে ও ন্যায্যতার মধ্যে জীবনযাপন করতে পারছে?
এই প্রশ্নের বাস্তব উত্তরই রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্য মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।











