উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তারা সাম্রাজ্যবাদী কৌশলে পৃথিবীর প্রায় ৮০ শতাংশ ভূখণ্ড এবং ৭৫ শতাংশ মানুষের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এই ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস পর্তুগালের মরক্কো দখলের মাধ্যমে ১৪১৫ সালের আগস্ট মাসে শুরু হয়, যা শেষ হয় ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের কাছে ম্যাকাও দ্বীপ হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে। সুদীর্ঘ এই ৬০০ বছরে কয়েক শ’ কোটি মানুষ বিভিন্ন সময়কালব্যাপী ঔপনিবেশিক নিপীড়ন ও শৃঙ্খলের শিকার হয়েছে।
স্পেন ১৪৯৩ সালে হাইতি ও ডোমিনিকান রিপাবলিক নিয়ে গঠিত হিসপানিওলা দ্বীপপুঞ্জে আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে উপনিবেশ স্থাপন শুরু করে এবং ১৮৯৮ সালে কিউবার স্বাধীনতা লাভের মধ্য দিয়ে তাদের ঔপনিবেশিক শাসনের সমাপ্তি টানে। অন্যদিকে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ১৬০৭ সালে ভার্জিনিয়ায় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে এবং ১৯৯৯ সালে হংকং হস্তান্তরের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে বিদায় নেয়। এছাড়াও, নেদারল্যান্ডস ১৬১৯ সালে জাকার্তা দখলের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ায় তাদের শাসন জারি করেছিল, যা ১৯৭৫ সালে দক্ষিণ আমেরিকার সুরিনামে তাদের শাসনের অবসান পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ নিয়াল ক্যাম্পবেল ফার্গুসন (জন্ম: ১৯৬৪) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন যে, মাত্র ৯০০ ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও ৭০,০০০ ব্রিটিশ সৈন্য কীভাবে ২৫ কোটিরও বেশি মানুষ অধ্যুষিত বিশাল ভারতবর্ষকে দীর্ঘকাল শাসন করতে পেরেছিল? এর উত্তরে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ব্রিটিশদের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, রেল-যোগাযোগ ব্যবস্থার কৌশলগত সামরিক ব্যবহার এবং ভারতীয় বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ এই অসাধ্য সাধনে ভূমিকা রেখেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় স্থায়ী সেনাবাহিনীতে ৩,০০০ ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও ৭৫,০০০ ব্রিটিশ সৈন্যসহ মোট ২,৮২,০০০ সামরিক ব্যক্তি ছিল। পরবর্তীতে এই বাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা প্রায় ১৪,৫০,০০০-এ উন্নীত হয়, যেখানে মূলত ভারতের দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তানদের নিম্ন বেতনে নিয়োগ দেওয়া হতো।
ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা মানেই যে ঔপনিবেশিক চিন্তাপদ্ধতির অবসান, তা কিন্তু নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যা সচেতন সংগ্রামের মাধ্যমেই জয় করতে হয়। শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য ঔপনিবেশিক শাসকরা স্থানীয় ইতিহাস, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ওপর যে বিকৃতি চাপিয়ে দিয়েছিল, তা স্বাধীনতার পরেও জনমানসে গভীর প্রভাব ফেলে।
এর ভয়াবহতার অন্যতম উদাহরণ হলো ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসরে সংঘটিত জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যা। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই মার্চ মাসে দিল্লিস্থ ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল ভারতীয়দের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও ‘অ্যানর্কিকেল অ্যান্ড রেভ্যুলুশনারি ক্রাইমস অ্যাক্ট’ নামক নিপীড়নমূলক আইন পাস করে। এই আইনের প্রতিবাদে পাঞ্জাবে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হলে স্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রেক্ষিতে উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। সে সময় জালিয়ানওয়ালাবাগে বৈশাখী উৎসব পালনের জন্য ১০ থেকে ১৫ হাজার নিরস্ত্র মানুষ সমবেত হন। তখন ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিল্যান্ড ডায়ারের নির্দেশে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে দশ মিনিট ধরে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করা হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ ঘটনায় ৩৭৯ জন নিহত এবং সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি-২। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উল্লেখ্য, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর সময়কালে, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ এক একটি ‘সাম্রাজ্য’ হিসেবে, সমষ্টিগতভাবে, পৃথিবীর প্রায় ৮০ ভাগ ভূমি ও প্রায় ৭৫ ভাগ মানুষের ওপর তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরিশেষে, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, বিভিন্ন উপনিবেশিত অঞ্চলে যুগপৎ জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক চেতনার বিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে, ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী শাসন-শোষণ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাছাড়া, ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহের ভেতর বিশ্বব্যাপী বাজার দখলের প্রতিযোগিতামূলক লড়াইকে কেন্দ্র করে সংঘটিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে, একদিকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহ অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, অন্যদিকে উপনিবেশিত দেশসমূহে কোথাও শুধু জাতীয়তাবাদী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে, উপনিবেশিত দেশগুলো একে একে স্বাধীন হতে থাকে এবং বিংশ শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর প্রায় সকল উপনিবেশিত দেশ ঔপনিবেশিক দখলদারত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাধারণভাবে, এই হলো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহের ৫০০ বছরের উত্থান-পতনের কালপঞ্জি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু আমরা যদি ১৪১৫ সালের আগস্ট মাসে পর্তুগাল কর্তৃক উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর উপনিবেশায়নকে পৃথিবীতে ইউরোপীয় উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করি, আর সেই পর্তুগাল কর্তৃক ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে ইতিপূর্বে উপনিবেশিত এশিয়ার ম্যাকাও দ্বীপকে চীনের কাছে। 1415, 1999, 600.

















