দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভারত ও চীন সীমান্ত বিরোধ নিরসনে আট দফা সমঝোতা নতুন কিছু প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের দুয়ার খুলে দিয়েছে। সামরিক হটলাইন স্থাপন, অতিরিক্ত সীমান্ত বৈঠকস্থল নির্ধারণ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনা এবং আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির তথ্য বিনিময়ের মতো পদক্ষেপগুলো সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সীমান্ত বিরোধের মূল জায়গাগুলোতে অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো এখনো রয়ে গেছে, যার ফলে একে দুই দেশের সম্পর্কের সামগ্রিক পুনর্মিলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
চলতি বছরের আগস্ট মাসে বেইজিংয়ে দুই দেশের সীমান্তবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের ২৫তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আট দফা সমঝোতাটি সামনে আসে। আলোচনার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে উভয় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ, ২০০৫ সালের রাজনৈতিক পরামিতি ও নির্দেশনামূলক নীতির আলোকে সীমান্ত সমাধানের প্রচেষ্টা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সীমানা নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যানেলে তাৎক্ষণিক সমাধানের কৌশল গ্রহণ করা। ১৯৮১ সাল থেকে দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত নিয়ে আলোচনা চালিয়ে আসছে, তবে ২০২০ সালের লাদাখ সংঘর্ষের পর সম্পর্কে যে গভীর অবনতি ঘটেছিল, তা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল করে তোলে। যদিও ২০২৪ সালে টহল-সংক্রান্ত সমঝোতা ও সেনা প্রত্যাহারের মাধ্যমে উত্তেজনা কিছুটা হ্রাস পায়, তবুও স্থিতিশীলতা এখনো নাজুক পর্যায়ে রয়েছে।
এই সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পূর্ব ও মধ্য সীমান্ত সেক্টরে দুটি নতুন সামরিক হটলাইন চালুর পরিকল্পনা। পাশাপাশি, ঊর্ধ্বতন সামরিক কমান্ডারদের আলোচনার জন্য আরও দুটি বৈঠকস্থল নির্ধারণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগগুলো সীমান্তে কোনো আকস্মিক ভুল বোঝাবুঝি বা উত্তেজনা তৈরি হলে দ্রুত সামরিক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করবে। এছাড়া ‘আর্লি অ্যান্ড সাবস্ট্যানশিয়াল হার্ভেস্ট’ বা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহজলভ্য এলাকাগুলোতে সমঝোতার ধারণাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে পুরো সীমান্ত বিরোধের সমাধানের অপেক্ষা না করে যেসব অঞ্চলে মতপার্থক্য কম, সেখানে সীমানা চিহ্নিতকরণ ও মানচিত্র প্রণয়নের কাজ আগেভাগে শুরু করার কথা ভাবা হচ্ছে। বড় ও জটিল বিরোধপূর্ণ এলাকাগুলো ভবিষ্যতের জন্য আলোচনার টেবিলে রাখা হয়েছে।
এই নতুন পদ্ধতির সুবিধা হলো ছোট ছোট বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে ধীরে ধীরে আস্থা অর্জনের সুযোগ তৈরি হওয়া। তবে একই সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। যদি আংশিক সমাধানের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা পূর্ণাঙ্গ সীমান্ত নিষ্পত্তির পরিবর্তে কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার একটি স্থায়ী কাঠামোতে পরিণত হতে পারে। ভারত ও চীনের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতাও বিদ্যমান। ভারত চীনের ওপর বাণিজ্য নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করলেও বাস্তবে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বহাল রয়েছে। সেই সঙ্গে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপণ্যের বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে উভয় পক্ষের উদ্বেগের জায়গাগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
নদীর পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। হিমালয়ের নদীগুলো, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র বা ইয়ারলুং সাংপো নদীকে ঘিরে ভারতের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। চীনা জলবিদ্যুৎ ও অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে ভারত নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। আট দফার আওতায় সেপ্টেম্বরেই বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠকে নদীর পানি ও জলবিদ্যুৎ-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়ার কথা রয়েছে, যা কেবল ভারত-চীন নয়, বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার পানিনিরাপত্তার জন্যও জরুরি।
১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় একটি ধাপ ছিল। সেখানে উভয় নেতা পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনার গুরুত্বারোপ করেন। তবে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই প্রেক্ষাপটে অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে মতবিরোধ, চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো এখনো জটিল সমীকরণ তৈরি করে রেখেছে। ২০২৭ সালে ভারতের আয়োজনে পরবর্তী বিশেষ প্রতিনিধি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা এই আট দফা সমঝোতার পরবর্তী অগ্রগতির মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। পরিশেষে বলা যায়, এই আট দফা সমঝোতা বর্তমান পর্যায়ে সীমান্ত সংঘাত নিয়ন্ত্রণে একটি কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী আস্থার সংকট কাটাতে মাঠপর্যায়ের আচরণ ও চুক্তি বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অপরিহার্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আগস্ট ২০২৬-এ বেইজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর নেতৃত্বে দুই দেশের সীমান্তবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের ২৫তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর আওতায় নির্দিষ্ট অঞ্চলের সীমা স্পষ্ট করার জন্য মানচিত্র প্রণয়ন ও প্রয়োজনে সীমা চিহ্নিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাম্প্রতিক সময়ে কূটনৈতিক, ব্যবসায়িক ও জনগণ-থেকে-জনগণ যোগাযোগও ধীরে ধীরে পুনরায় সক্রিয় হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে কোনো প্রকল্পকে সরাসরি ‘পানি অস্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করার আগে প্রকল্পের প্রকৃত সক্ষমতা, পরিচালন পদ্ধতি, তথ্য বিনিময় এবং ভাটির দেশগুলোর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্যদিকে ভারতও চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থানকে নিজের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই বাস্তবতায় আট দফা সমঝোতার মূল গুরুত্ব সম্ভবত সীমান্ত বিরোধের চূড়ান্ত সমাধানে নয়, বরং বিরোধকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য রাখার ব্যবস্থায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভারত-চীন সম্পর্কের বর্তমান পর্যায়কে তাই ‘সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে গেছে’ বলার চেয়ে ‘সংঘাত নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর্যায়’ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

















