জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার সময় আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্লাবিত জনপদ, জ্বলতে থাকা বন কিংবা প্রচণ্ড দাবদাহের মতো দৃশ্য। কিন্তু নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘২০২৬ এনওয়াইইউ স্টার্ন ক্লাইমেট ইকোনমিকস জার্নালিজম ফেলোশিপে’ অংশ নেওয়ার পর আমার কাছে বিষয়টি নতুনভাবে ধরা দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৫ জন সাংবাদিকের সঙ্গে এই ফেলোশিপের অংশীদার হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাবগুলো নিবিড়ভাবে পর্যালোচনার সুযোগ হয়েছে আমার।
ম্যানহাটানে আমরা যখন জলবায়ু অর্থনীতির খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা করছি, তখন কয়েক মাইল দূরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে চলছিল সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই সাধারণ বিতর্কে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা বৈশ্বিক সংকট ও নিজেদের অগ্রাধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, যা দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিউইয়র্কজুড়ে প্রায় দেড় হাজারের বেশি সরকারি-বেসরকারি ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা এই শহরকে জলবায়ু আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। একই সময়ে নিউইয়র্কজুড়ে চলে জলবায়ু সপ্তাহ।
২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায্য রূপান্তর নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন হয়। এর পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই অধিবেশনগুলোতে যোগ দিতে নিউইয়র্কে গিয়েছিলেন। ২২ সেপ্টেম্বর তিনি সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশ নেন এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেন। তাঁর কর্মসূচিতে জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকির মতো ইস্যুগুলো গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
জলবায়ু আলোচনার মূল কেন্দ্রে এখন কিছু প্রশ্ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: বিশ্ব কত দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে পারবে? জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কীভাবে কমবে? নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের উৎস কী হবে এবং এই পরিবর্তনের আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে? স্টার্ন স্কুলে আমাদের আলোচনায় এসব বিষয় বেশ গুরুত্ব পায়। জলবায়ু অর্থায়ন, বীমা, বিনিয়োগ এবং জীববৈচিত্র্য হারানোর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণের সময় গত কয়েক মাসের যুক্তরাষ্ট্রের দাবানল পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা আমার সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরুর দিকে পরিবেশের সমস্যা মনে হলেও, শেষ পর্যন্ত তা একটি জটিল অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেয়। সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, গবেষক, বিনিয়োগকারী, পরিবেশ ও জলবায়ু সংগঠন এবং সাংবাদিকেরা অংশ নেন এসব আয়োজনে। আগুন নেভার পরও দাবানলের গল্প শেষ হয় না। জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ক্রমবর্ধমান ক্ষতি কীভাবে সাধারণ মানুষ ও বীমা খাতকে প্রভাবিত করছে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীরা কীভাবে নতুন জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে, সেসব বিষয়ও উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি প্রকট। তাই আমাদের জন্য জলবায়ু অর্থায়ন কেবল কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়, এটি সরাসরি মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। উপকূলীয় জনপদ, কৃষি এবং সুপেয় পানির সংকট বিবেচনায় নিলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য কোনো বিমূর্ত আশঙ্কা নয়, বরং কঠোর বাস্তবতা। নিউইয়র্কের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো থেকে প্রাপ্ত অর্থের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর কাছে পৌঁছাবে এবং তা অভিযোজনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনে আয়বৈষম্য যেভাবে দায়ী। জ্বালানি, অর্থায়ন, পরিচ্ছন্ন প্রবৃদ্ধি, খাদ্য ও কৃষি, জলবায়ু ও স্বাস্থ্য, প্রকৃতি, প্রযুক্তি এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচার আলোচনার বিষয়ের পরিধিও বিস্তৃত। নিচু উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য ক্রমবর্ধমান এই ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং কার্যকর সমাধানের বিষয় সেখানে আলোচনা হয়।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী। একদিকে তাদের প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের জন্য জ্বালানি প্রয়োজন, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় ব্যয় করার মতো বিশাল অর্থের সংস্থানও তাদের করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোটা বেশ কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার বিষয়। কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান নয়, বরং যারা এর ক্ষতির শিকার হচ্ছে, তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বৈশ্বিক বৈষম্য দূর করা একান্ত প্রয়োজন। ধনী ও দরিদ্র দেশের অভিযোজন সক্ষমতায় যে বিশাল ফারাক রয়েছে, সেটিই জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রধান অন্তরায়। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশ এবং বড় জ্বালানি উৎপাদক ও ব্যবহারকারী দেশের নেতাদের সেখানে একত্র করাই ছিল লক্ষ্য।
নিউইয়র্কের অভিজ্ঞতা থেকে আমি এটাই উপলব্ধি করেছি যে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশের গল্প নয়। এটি অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও উন্নয়নের এক সমন্বিত রূপ। একজন সাংবাদিক হিসেবে দুর্যোগের খবরের পাশাপাশি অর্থের গতিপথ অনুসরণ করা এখন সময়ের দাবি। জলবায়ুর অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং সেখান থেকে কে সুবিধা পাচ্ছে, তা উন্মোচন করা জরুরি। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি নিয়ে প্রতিবেদন করার সময়ও আমি শুধু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা নয়, বরং ক্ষতির আর্থিক মাত্রা ও পুনরুদ্ধারের টেকসই পদ্ধতিগুলো নিয়ে কাজ করতে চাই।
পরিশেষে, নিউইয়র্কে কাটানো এই কয়েকদিন আমাকে নতুন কিছু জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো দুর্যোগের পর আমি এখন জানতে চাইব, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বীমা সুবিধা আছে কি না, পুনরুদ্ধারের অর্থ কোন খাত থেকে আসছে এবং স্থানীয় ব্যবসা ও শ্রমিকদের অবস্থা কেমন হচ্ছে। দুর্যোগের পাশাপাশি এই অর্থনৈতিক কাঠামো বোঝা গেলে হয়তো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের লড়াইয়ে একটি নতুন পথ উন্মোচিত হবে। মোছাব্বের হোসেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মন্টানায় পরিবেশবিজ্ঞান ও ন্যাচারাল রিসোর্স জার্নালিজমে অধ্যয়নরত।











