হুবহু একই রকম দেখতে দুই বোন। তাদের গায়ে জড়ানো ছিল একই রঙের পোশাক, সাজগোজেও কোনো তফাত নেই। এমনকি হাতের ব্যাগটির রঙেও মিল ছিল ষোলো আনা। যশোর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সবার নজর কাড়ে এই যমজ বোন সাবিহা রহমান ও সামিহা রহমান। এমনকি তাদের ব্যবহৃত পার্সের (হাতব্যাগ) রংটাও এক। কেউ কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়ে সেলফি তুলতে।
শুক্রবার সকালে বাবা সাইদুর রহমান দুই বোনকে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে দেন। সেখানে পৌঁছেই দীর্ঘদিনের বন্ধুদের পেয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে তারা। সামিহা জানায়, প্রতিবছর ও শিখোর আয়োজনে কৃতী শিক্ষার্থীদের এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠান তারা দেখত। বড়দের দেখে তাদের মনেও স্বপ্ন জাগত এমন একটি মঞ্চে আসার। অবশেষে দুজনে একসঙ্গে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে এবং এই উৎসবে শামিল হতে পেরেছে। বন্ধুদের সঙ্গে পুনর্মিলনের এই মুহূর্তটিকে তারা অন্য রকম এক অনুভূতি বলে উল্লেখ করে। অবশেষে আমরা দুই বোন একসঙ্গেই পরীক্ষা দিয়েছি, জিপিএ–৫ পেয়েছি। বড় বোনদের দেখে আমরাও স্বপ্ন দেখতাম কবে সংবর্ধনা পাব।
আরেক বোন সাবিহা রহমান জানায়, শৈশব থেকেই তাদের পথচলা একসঙ্গে। তারা প্রাথমকি স্তরে যশোর শহরের সেক্রেড হার্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (বড় মিশন স্কুল) পড়েছে। এরপর মাধ্যমিকে ভর্তি হয় সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে। তবে পরীক্ষার পর তাদের কলেজের পথ আলাদা হয়ে গেছে। ফলাফলের কারণে একজন ভর্তি হয়েছে যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজে এবং অন্যজন যশোর সরকারি মহিলা কলেজে। সাবিহা আরও জানায়, তারা সবসময় একই রঙের পোশাক পরে, একসঙ্গে খায় ও ঘুমায়। এই উৎসবের জন্যও তারা আগে থেকেই একই পোশাক নির্বাচন করে রেখেছিল। সংবর্ধনায় আসতে পেরে উচ্ছ্বসিত আরেক বোন সাবিহা রহমানও।
পুরোনো বন্ধুদের আড্ডায় মেতে ওঠার পর তারা নিজেদের প্রিয় ক্লাসরুম ও স্কুলের টিফিন পিরিয়ডের আড্ডার জায়গাগুলো খুঁজতে থাকে। সেই স্মৃতিময় স্থানগুলো খুঁজে না পেয়ে চার বান্ধবী মিলে চলে যায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে। সেখানে তাদের প্রিয় শিক্ষক আহসান হাবীব পারভেজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তারা পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করে।
সারাদেশের ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে ৬৪টি জেলায় এই কৃতী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে এই উৎসবের মূল আয়োজক এবং পৃষ্ঠপোষকতা করছে শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’। এই আয়োজনে পাওয়ার্ড বাই হিসেবে যুক্ত রয়েছে বিকাশ। এছাড়া সহযোগী হিসেবে রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও বন্ধুসভা।
সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে মূল পর্বের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন যশোর প্রতিনিধি মনিরুল ইসলাম। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জেলা বন্ধুসভার পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক ইকলিমা ইয়াসমিন ইমা। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা দিতে যশোর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আহসান হাবীব পারভেজ অতীতের একটি গল্প শোনান। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের দিন জিপিএ-৫ না পেয়ে এক ছাত্রী অঝোরে কাঁদছিল এবং আক্ষেপ করে বলেছিল, সে মা-বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু সেই মেয়েটিই দুই বছর পর এসে জানায় যে সে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। অথচ তার সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও জায়গা পায়নি। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পাওয়াটাই শেষ কথা নয়, সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও বজায় রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে যশোর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ আহমদ ফেরদৌস জাহাঙ্গীর শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ভালো ফলাফল মানুষের দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। সাফল্যের দুটি দিক রয়েছে—একটি হলো নিজেকে সম্মানজনক স্থানে নিয়ে যাওয়া এবং অন্যটি হলো ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। পরে শিক্ষার্থীদের মিথ্যা, মুখস্থ ও মাদককে ‘না’ বলার শপথ বাক্য পাঠ করান ডেপুটি নিউজ এডিটর তুহিন সাইফুল্লাহ।
অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে অনুভূতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেয় ঝংকার মজুমদার। নৃত্য পরিবেশন করে মঞ্চ মাতিয়ে রাখে জারিন তাসনিয়া রূপকথা ও নিশাত তাসনিম দিশা। এরপর অনলাইন কুইজ প্রতিযোগিতার ১০ জন বিজয়ীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। সবশেষে প্রধান পৃষ্ঠপোষক শিখোর প্রতিনিধি দলের সদস্যরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন কুইজ ও অনুপ্রেরণামূলক সেশনে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠের খন্দকার ইমরান এবং শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে সাতজন তরুণ শিল্পী সংগীত ও আবৃত্তি পরিবেশন করে অনুষ্ঠানটি জমিয়ে তোলে।












