ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শেখ মুজিবুর রহমান হলের মূল ফটক থেকে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নাম মুছে ফেলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই উদ্যোগ গ্রহণ করে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে ফটকে পুনরায় ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নামটি স্থায়ীভাবে লিখে দেওয়া হবে এবং চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এই কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও শেখ মুজিবুর রহমান হল সংসদের পক্ষ থেকে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর স্বাক্ষরসংবলিত একটি স্মারকলিপি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়।
হলের সিনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার জবান আলী জানান, নতুন নামকরণের কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘদিনের মৌখিক দাবি ও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশাসনিকভাবে হলটির পূর্বের নাম ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হলটি এখন থেকে পুনরায় ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ হিসেবেই স্বীকৃত থাকবে। এ বিষয়ে জানতে হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে ফোন কলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
হলটির নাম পরিবর্তনের এই ঘটনাপ্রবাহ শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর রাতে, যখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা ফটকের নাম মুছে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লিখে দেন। এর নেপথ্যে ছিল শরীফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যু-পরবর্তী প্রেক্ষাপট। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৮ আসন থেকে লড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণের সময় ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর পল্টনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। হাদির মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীরা তাকে সম্মান জানাতে হলের নাম পরিবর্তনের এই প্রতীকী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে ওই নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি মারা যান।
পরবর্তী সময়ে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দেয়। গত ৮ জানুয়ারি ঢাবি সিন্ডিকেট সভায় শেখ মুজিবুর রহমান হলসহ পাঁচটি স্থাপনার নাম পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছিল, যার মধ্যে এই হলের নাম ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ করার প্রস্তাবও ছিল। তবে ২৯ জুন সিনেট অধিবেশনে এ বিষয়টি উপস্থাপিত হলে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দেয়। অধ্যাপক সামিনা লুৎফাসহ একাধিক সিনেট সদস্য নাম পরিবর্তনের বিরোধিতা করেন। একইসাথে ফজলুল হক মিলন হলটির নাম জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে করার প্রস্তাব তুললে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। গত ২৯ জুন সিনেট অধিবেশনের আলোচ্যসূচিতে বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে সদস্যদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দেয়।
সিনেট অধিবেশনে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পেরে উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বিষয়টি পুনরায় সিন্ডিকেটে পাঠানোর নির্দেশনা দেন। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ডাকসুর পাঁচ সিনেট সদস্য—ভিপি সাদেক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদ, এজিএস মুহাম্মদ মহিউদ্দিন, পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ ও সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন। দীর্ঘ জটিলতার পর অবশেষে প্রশাসন বিভ্রান্তি নিরসনের দোহাই দিয়ে আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর করল।

















