পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব পালনের পদ্ধতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার জন্য ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগেই বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে হবে বলে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, বাহিনীর ভেতর ‘পুরস্কার ও শাস্তি’ নীতি কার্যকর থাকবে, যেখানে ভালো কাজের জন্য স্বীকৃতি এবং ব্যর্থতা বা শৃঙ্খলাভঙ্গের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত পুলিশ পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ফৌজদারি অপরাধে ছাড় নেই
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কঠোর ভাষায় জানান, কোনো পুলিশ সদস্য যদি ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, তবে তার শাস্তি কেবল বিভাগীয় ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। অপরাধী যেই হোক, প্রচলিত আইনেই তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে এবং বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণ এখন প্রকৃত অর্থেই ‘জনগণের পুলিশ’ দেখতে চায়। জ্যেষ্ঠ বা অধস্তন কোনো সদস্যেরই এমন আচরণ করা উচিত নয়, যা সাধারণ মানুষের কাছে অগণতান্ত্রিক বা অস্বাভাবিক মনে হয়। অতীতে অনেক পুলিশ সদস্যকে অবৈধ নির্দেশ পালনে বাধ্য করা হলেও, বর্তমান সরকার তাদের স্বাধীনভাবে এবং আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের পূর্ণ সুযোগ দিচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অন্যদিকে দায়িত্বে অবহেলা, শৃঙ্খলাভঙ্গ বা অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইভাবে অধস্তন সদস্যদের এমন কর্মকাণ্ডও প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না, যা সমাজে অশান্তি বা অস্বস্তি তৈরি করে।
আধুনিকায়ন ও নতুন ইউনিট
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পুলিশকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী। আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আগামী সপ্তাহে একটি পৃথক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠন করা হবে বলেও তিনি জানান। এর সদর দপ্তরের পাশাপাশি মেট্রোপলিটন, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শাখা থাকবে। ধাপে ধাপে আধুনিক ফরেনসিক ল্যাবসহ উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, সাইবার অপরাধের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া পুলিশের বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিটকে নতুন কাঠামোর আওতায় এনে অবকাঠামো ও লজিস্টিক সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে পুলিশকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও অপরাধ দমনে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে এমন ব্যক্তিদের বিষয়ে গোয়েন্দা সক্ষমতা কাজে লাগানোর নির্দেশও দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সততা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপহীনতা
- সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম নিয়ে কাজ করলে পুলিশ সমাজ পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।
- বর্তমান সরকার পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশে আইন মেনে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে।
- কেউ দায়িত্ব পালনে ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ পাবেন, তবে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না থাকলে বা অপরাধে জড়ালে পরিণতি ভালো হবে না।
- দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় এবং অস্থিতিশীলতা রোধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- অনুষ্ঠানে ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে নির্বাচিত পুলিশ সদস্যদের পদক প্রদান করা হয়।
এ সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরসহ বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুনরায় গুরুত্বারোপ করেন যে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশের মূল লক্ষ্য। বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে দেশ ও মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে হবে এবং যে কোনো মূল্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। সরকারের এই কঠোর অবস্থানের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীতে একটি নতুন সংস্কৃতির সূচনা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। জনবল বৃদ্ধি এবং লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানোর মাধ্যমে পুলিশকে একটি যুগোপযোগী বাহিনীতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতিও তিনি দেন এই অনুষ্ঠানে।

















