ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের একের পর এক হামলার মুখে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করছে সৌদি আরব। গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন বলে সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। এই ঘটনার পর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সৌদি আরবের পরবর্তী রণকৌশল নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সৌদি আরব সামরিক অভিযান এবং আলোচনার মাধ্যমে হুতিদের আধিপত্য ঠেকানোর চেষ্টা করে আসছে। রিয়াদ দীর্ঘ এক দশক ধরে এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে, যা ইয়েমেনে ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। বর্তমান পরিস্থিতি কেবল পুরনো শত্রুতার গণ্ডিতে আটকে নেই; বিশ্লেষকদের মতে, এটি ওয়াশিংটন ও তেহরানের চলমান সংঘাতের একটি নতুন মোড় হিসেবে সামনে আসছে। তবে সম্প্রতি সৌদি আরবে আবার হুতিদের হামলা বেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে শুধু আগের শত্রুতার জেরে নয়, বরং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের সম্প্রসারণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। গোষ্ঠীটি ইয়েমেনের বড় কয়েকটি শহরের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেছে এবং জনবহুল তাইজের মতো আরও কিছু শহর দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রতিবেদনে ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্লেষক আলী শিহাবি সিএনএনকে বলেন, এই হুমকি স্থায়ীভাবে নির্মূল করা প্রয়োজন। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সৌদি আরব বিমান হামলার মাধ্যমে সহায়তা দিচ্ছে, তবে স্থলভাগে সরাসরি বড় ধরনের সেনা মোতায়েন থেকে দেশটি বিরত রয়েছে। এখন রিয়াদ তাদের এই সংযম নীতি বজায় রাখবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, সৌদি আরব সরাসরি স্থলযুদ্ধে জড়ালে তা দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যয়বহুল হতে পারে, যা দেশটির বর্তমান বিনিয়োগবান্ধব ও পর্যটনমুখী ভাবমূর্তির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। দুই দশক আগের একটি ছোট ধর্মভিত্তিক আন্দোলন আজ শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হয়েছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অভিযোগ, হুতিরা ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় তাদের অস্ত্রভাণ্ডার আরও আধুনিক ও কার্যকর করে তুলেছে। ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলি জানান, তাদের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তাপ অনুসরণকারী এবং উচ্চগতিসম্পন্ন। তাদের হাতে এখন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এবং তেল আবিবের মতো দূরবর্তী লক্ষ্যেও হামলা চালানোর সক্ষমতা আছে।
প্রযুক্তির ব্যবহারেও হুতিরা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জানা গেছে, উত্তর ইয়েমেনের একটি গোষ্ঠী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সরঞ্জাম ‘ক্লড’ ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্রের গাইডেন্স সফটওয়্যার তৈরিতে সহায়তা নিয়েছে। এই প্রযুক্তি অস্ত্রের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখে। দক্ষিণ ইয়েমেনে লড়াইরত এক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, হুতিদের যুদ্ধের কৌশল, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং দৃঢ়তা আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। তবে তারা হুতিদের নিয়ন্ত্রিত উত্তর ইয়েমেনে অবস্থান করায় বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাদের সম্ভাব্য যোগসূত্র থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সৌদি আরব এই সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন মিত্র দেশের কাছ থেকে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তান সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখনো সরাসরি বিমান হামলায় জড়াতে রাজি হয়নি। এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র একটি যৌথ কমান্ডের মাধ্যমে ১০০ জনের বেশি সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়ে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে। গত মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুইবার কথা বলে হামলার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে নিজেদের ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার শিকার হওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। কিন্তু এবার হুতিদের সঙ্গে সংঘাত এড়াতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তাঁর ভাই, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালেদ বিন সালমানের সামনে খুব বেশি বিকল্প পথ খোলা নেই। এতে স্থিতিশীল, বিনিয়োগবান্ধব দেশ ও বৈশ্বিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবের যে ভাবমূর্তি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সতর্কতা ও যত্নের সঙ্গে গড়ে তুলছেন, সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
রিয়াদের সাম্প্রতিক হামলার পর ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন যে, সৌদিরা দক্ষ যোদ্ধা হলেও ঘটনাটি ভয়াবহ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের বিরুদ্ধে হামলায় সরাসরি যোগ দেবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তারা এই কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে। বিশ্লেষক আলী শিহাবি মনে করেন, মার্কিন যুদ্ধবিমান ও স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তা পেলে হুতিদের মোকাবিলা করা সৌদি আরবের জন্য সহজতর হবে।
বর্তমানে হুতিরা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে বারবার হামলা চালাচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বাব আল-মানদেব প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ সুরক্ষিত রাখতে গত বছর একটি যুদ্ধবিরতি হলেও তা এখন কার্যত অকার্যকর। হুতিদের এই ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সৌদি আরব এবং তাদের মিত্রদের পরবর্তী পদক্ষেপই এখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

















