ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় দেশের প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। সরকারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূল লক্ষ্য হলো সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাজধানীর তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন। এসময় সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচির অগ্রগতি ও সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে জনগণকে জানাতেই এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
নারীর ক্ষমতায়ন, মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। এই লক্ষ্য অর্জনে পরিবারের নারীপ্রধানদের নামে ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরে নতুন করে ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধানকে এই কার্ড ও ভাতা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আগামী তিন বছরের মধ্যে যোগ্য সকল নারী পরিবারপ্রধানকে এই কর্মসূচির আওতাভুক্ত করা হবে। পিএমটি স্কোর ৮৬০ বা তার কম হলে নারী পরিবারপ্রধানকে ভাতা পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে ভাতা দেওয়া হবে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কোয়ান্টাইলভুক্ত পরিবারগুলোর নারীপ্রধানদের, যাদের আর্থসামাজিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল। প্রতি পাঁচজন সদস্যকে একটি পরিবার হিসেবে ধরে এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে, গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছিলেন। পাইলট প্রকল্পের আওতায় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আটটি বিভাগের ৪৪টি জেলার ৫৫টি উপজেলা এবং সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ইউনিটে ১ লাখ ১২ হাজার ৯৪টি পরিবারের তথ্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রক্সি মিন্স টেস্ট (পিএমটি) স্কোরের ভিত্তিতে ৭১ হাজার ৮৩১ জন যোগ্য উপকারভোগীকে ভাতার আওতায় আনা হয়। পাইলট প্রকল্পের জন্য ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় হয়েছে ৬৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, যার মধ্যে ৫৭ কোটি ২০ লাখ টাকা সরাসরি ভাতা হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রকল্পের মূল বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই কর্মসূচির জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মধ্যে ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকাই ব্যয় হবে ভাতার জন্য। নতুন এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে তৈরি করা হয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পিএমটি পদ্ধতির মাধ্যমে পরিবারগুলোকে পাঁচটি কোয়ান্টাইলে ভাগ করা হয়েছে: অতিদরিদ্র, দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। মূলত প্রথম তিনটি কোয়ান্টাইলের নারীপ্রধানরাই ভাতা পাবেন।
সোমবার থেকে দেশজুড়ে শুরু হওয়া এই তথ্য সংগ্রহের কাজে ৬৬ হাজার ৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী এবং ৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার সরাসরি মাঠে রয়েছেন। তাদের সহায়তায় প্রণয়ন করা হয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড খানা তথ্যভান্ডারের তথ্য সংগ্রহ নির্দেশিকা, ২০২৬’। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিশেষায়িত ট্যাবলেটের মাধ্যমে এই তথ্য নেওয়া হচ্ছে, যা সরাসরি অনলাইন ডেটাবেজে যুক্ত হবে। নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার (এনওসি), সাইবার নিরাপত্তা এবং কর্মী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সব প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণের প্রথম পর্যায়ও সম্পন্ন হয়েছে।
এই কার্ডগুলোতে ডুয়াল চিপ, কিউআর কোড এবং নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন (এনএফসি) প্রযুক্তি থাকবে। সরকার এই কার্ডকে সরাসরি ক্যাশলেস পেমেন্ট ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত করছে। ফলে উপকারভোগীরা ব্যাংকের এটিএম বুথ, পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) মাধ্যমে ভাতার টাকা সহজে উত্তোলন করতে পারবেন। প্রতিটি পাঁচ সদস্যের পরিবারকে একটি একক হিসেবে বিবেচনা করে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সারা দেশের প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের ডেটাবেজ তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

















