ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর জন্য অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ২৮টি ওয়ার্ডকে মাঝারি ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে। মশার ঘনত্ব বিচারে দেখা গেছে, এই দুটি শ্রেণি মিলিয়ে দক্ষিণ সিটির মোট ওয়ার্ডের অন্তত ৭৬ শতাংশ বা ৫৭টি ওয়ার্ডই ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। অবশিষ্ট ১৮টি ওয়ার্ড রয়েছে সাধারণ ঝুঁকিতে।
ডিএসসিসি পরিচালিত ‘বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপ ২০২৬’-এর ফলাফল ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম সেখানে উপস্থিত থেকে এডিস মশার লার্ভা পরিস্থিতি ও করপোরেশনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। আজ বুধবার নগর ভবন মিলনায়তনে ‘বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপ ২০২৬’-এর ফলাফল প্রকাশ ও পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। করপোরেশনের ভাষ্য, দৈবচয়নের ভিত্তিতে নমুনা বাছাই করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জরিপটি পরিচালিত হয়েছে।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোধের উদ্দেশ্যে গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত একটানা ১২ দিন এই জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ডিএসসিসি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার যৌথ উদ্যোগে গঠিত ৩৬ জন মাঠকর্মী দৈবচয়ন ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ৩০টি করে মোট ২ হাজার ২৫০টি বসতবাড়ির তথ্য সংগ্রহ করেন। এতে ডিজিটাল প্রযুক্তি হিসেবে ‘কবো টুলবক্স’ ব্যবহার করা হয় এবং পরবর্তীতে ব্রেটো, হাউস, কনটেইনার ও পিউপা ইনডেক্সের ভিত্তিতে সামগ্রিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়। সংস্থাটির ২ হাজার ২৫০টি বাড়িতে জরিপ চালায়।
জরিপে পরিদর্শন করা মোট বাড়ির মধ্যে ৩২২টি বাসাবাড়িতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে, যা জরিপকৃত মোট ভবনের প্রায় সাতটির মধ্যে একটি। বাসাবাড়ির ভেতরের পাত্রে দেখা গেছে, প্লাস্টিকের বালতিতে লার্ভা মেলার হার সবচেয়ে বেশি—১৪ দশমিক ২১ শতাংশ। এ ছাড়া প্লাস্টিকের ড্রামে ১১ দশমিক ২২ শতাংশ, ভবনের বেজমেন্টে জমা থাকা পানিতে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ, প্লাস্টিকের মগে ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং বাসাবাড়ির ফুলের টবে ৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ লার্ভার উপস্থিতি দেখা গেছে। অর্থাৎ জরিপের আওতায় আসা প্রতি সাতটি বাড়ির প্রায় একটিতে এর উপস্থিতি মিলেছে। ডিএসসিসি বলছে, নিজ বাড়ির আঙিনা ও পাত্রে জমে থাকা পানির বিষয়ে নাগরিকেরা সচেতন হলে মশার প্রজননস্থলের বড় অংশ শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ডিএসসিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জরিপে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত ২৯টি ওয়ার্ড হলো—১, ২, ৯, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩১, ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৮, ৫৯, ৬০, ৬১, ৬২, ৬৫ এবং ৭১।
অন্যদিকে মাঝারি ঝুঁকিতে থাকা ২৮টি ওয়ার্ড হলো—৪, ৫, ৬, ৮, ১০, ১৮, ২৩, ২৯, ৩০, ৩২, ৩৩, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪৩, ৪৬, ৫১, ৫২, ৫৭, ৬৪, ৬৭, ৬৮, ৬৯, ৭৩ এবং ৭৫। তবে প্রকাশ করা বিজ্ঞপ্তিতে সূচকের সুনির্দিষ্ট মান কিংবা ঝুঁকির শ্রেণি নির্ধারণের পূর্ণাঙ্গ মানদণ্ডের বিস্তারিত উল্লেখ রাখা হয়নি।
ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, মশক নিয়ন্ত্রণে সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। নিজের ঘরবাড়ি ও কাজের স্থানের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সপ্তাহে অন্তত এক দিন জমাপানি ফেলে দেওয়ার সচেতন অভ্যাস গড়ে তোলার অনুরোধ জানান তিনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, লার্ভা জরিপের ভিত্তিতে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ মশকনিধন ও সচেতনতা মূলক প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, শিশুদের সুরক্ষায় প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযানের অংশ হিসেবে করপোরেশন এলাকার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ ও শৌচাগার বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বাসাবাড়ির অপ্রয়োজনীয় পানি জমতে পারে এমন পাত্র ফেলে দেওয়া বা নিয়মিত ঘষে পরিষ্কার করার বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়, কারণ শুষ্ক আবহাওয়াতেও এডিসের ডিম মাসের পর মাস জীবিত থাকতে পারে। পাত্রের গায়ে লেগে থাকা ডিম দূর করতেও ঘষে পরিষ্কার করা জরুরি।

















