ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য একই সঙ্গে অর্জন ও ক্ষতির এক জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ তৈরি করেছে। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর সময় মস্কোর প্রধান প্রত্যাশা ছিল দ্রুত সামরিক সাফল্য অর্জন, কিয়েভের ওপর পূর্ণ প্রভাব প্রতিষ্ঠা এবং ইউক্রেনকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর বলয়ের বাইরে রাখা। তবে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতের ফলে রাশিয়া একদিকে কিছু আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও অন্যদিকে দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থান ও সামরিক সক্ষমতা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও জাতীয় ঐক্যের যুক্তিতে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার কর্তৃত্ব আরও দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে সমান ক্ষমতার অংশীদারত্ব নয়। অবশ্য ইউক্রেনও ভয়াবহ মানবিক, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতির শিকার। দেশটির বহু শহর ধ্বংস হয়েছে, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের চাপ সামলাতে হচ্ছে। পুতিনের সবচেয়ে বড় হিসাবের অমীমাংসিত প্রশ্ন।
যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি ও অর্জনের খতিয়ান
যুদ্ধের সবচেয়ে দৃশ্যমান কৌশলগত অর্জন হিসেবে রাশিয়ার হাতে ইউক্রেনের কিছু ভূখণ্ডের সামরিক নিয়ন্ত্রণ উঠে এসেছে। কিন্তু যুদ্ধের পরিণামে ন্যাটো আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের পর ইউরোপ রুশ জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেয়।
ক্রিমিয়া ছাড়াও দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, জাপোরিজিয়া ও খেরসন অঞ্চলের বড় অংশ বর্তমানে রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এসব ভূখণ্ডকে রাশিয়া নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে, যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বৃহত্তর অংশ এই সংযুক্তিকে স্বীকৃতি দেয়নি।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গবেষণা অনুযায়ী, রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের মোট আয়তনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালে দখলে নেওয়া ক্রিমিয়া ও দনবাসের পুরনো অংশের পাশাপাশি ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর নতুন করে দখল করা ভূখণ্ড রয়েছে, যা ইউক্রেনের মূল আয়তনের প্রায় ১২ শতাংশ। এগুলো স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত চূড়ান্ত সংখ্যা নয়; গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব।
এই ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ রাশিয়াকে আজভ সাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত অবস্থান প্রদান করেছে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর থেকেই উপদ্বীপটি রাশিয়ার সামরিক ও ভূরাজনৈতিক কৌশলের মূল কেন্দ্র ছিল। ২০২২ সালের সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মস্কো ক্রিমিয়ার সঙ্গে দনবাস এবং দক্ষিণ ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলগুলোর মধ্যে সরাসরি স্থলাভিযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। তবে সামরিক নিয়ন্ত্রণকে স্থায়ী রাজনৈতিক বা আইনগত মালিকানা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর ধারাবাহিক প্রতিআক্রমণ, ড্রোন হামলা এবং সরবরাহ লাইনে আঘাতের কারণে এই অঞ্চলগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা রাশিয়ার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ভৌগোলিক সুবিধা অর্জিত হলেও সেই সুবিধা নিরাপদ রাখা ক্রমেই ব্যয়বহুল হচ্ছে। ইউক্রেনের ন্যাটোঘনিষ্ঠতা রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য হুমকি—এমন যুক্তি তুলে ধরেই মস্কো যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
সামরিক শিল্পের বিকাশ ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন
ইউক্রেন সংঘাত রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্পকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের সুযোগ করে দিয়েছে। গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র, সামরিক ড্রোন এবং ভারী সাঁজোয়া যান নির্মাণের কারখানাগুলো ২৪ ঘণ্টা চালু রেখে দেশটির সামরিক উৎপাদন অভাবনীয় মাত্রায় বৃদ্ধি করা হয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) ২০২৬ সালের মার্চের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাশিয়ার যুদ্ধ ও অন্যান্য সামরিক খাতে সরকারি বাজেট বরাদ্দ প্রায় ১৬ ট্রিলিওন রুবলে পৌঁছেছিল, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এটি রাশিয়ার অর্থনীতিতে সামরিক উৎপাদনের ব্যাপকতা বোঝায়।
তবে সামরিক শিল্পের এই প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নির্দেশক নয়। বেসামরিক খাত, অভ্যন্তরীণ সেবা ও ভোক্তা অর্থনীতিতে এর ক্ষতিকর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ব্যাপক পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পরও রাশিয়া জ্বালানি রপ্তানির গতিপথ পরিবর্তন করে চীন ও ভারতের মতো এশীয় বাজারে বাণিজ্য বৃদ্ধি করেছে, যা ইউরোপীয় বাজার হারানোর ধাক্কা আংশিক সামাল দিতে সাহায্য করেছে। পুতিন এই যুদ্ধকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজের ক্ষমতা সংহত করার অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং জাতীয় নিরাপত্তার বার্তা দিয়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছেন। বেসামরিক শিল্প, শ্রমবাজার ও ভোক্তা অর্থনীতির ওপর এর চাপও বাড়ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞার পরও রাশিয়ার অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে যুদ্ধকে অনেক সময় রাশিয়ার অস্তিত্ব ও ঐতিহাসিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। জনমত পরিমাপের ক্ষেত্রে স্বাধীন জরিপ, রাষ্ট্রীয় প্রচার এবং ভয়ের পরিবেশের প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিপুল জনবল ক্ষয় ও রণক্ষেত্রের সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতি
এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীকে। দীর্ঘস্থায়ী আক্রমণ ও প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে। সিএসআইএসের ১ জুলাই ২০২৬-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত রুশ বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা আগের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে রাশিয়ার নতুন সেনা নিয়োগের হারের চেয়ে রণক্ষেত্রে হতাহতের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে নিহতের সংখ্যা ৪ লাখ থেকে সাড়ে ৪ লাখ হতে পারে বলে গবেষণাটিতে অনুমান করা হয়েছে।
২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে রণক্ষেত্রের চিত্র মস্কোর জন্য নতুন দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে। ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের ১ নভেম্বর ২০২৬-এর মূল্যায়নে উঠে এসেছে যে, অক্টোবর মাসে রুশ বাহিনী ইউক্রেনের প্রায় ১৩৯ দশমিক ৮৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হলেও প্রায় ১৬৭ দশমিক ১৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়েছে। ফলে মাসটিতে তাদের নিট ভূখণ্ডগত ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ২৯ বর্গকিলোমিটার। অন্যদিকে, সিএসআইএসের গবেষণায় দেখা গেছে রুশ বাহিনীর দৈনিক অগ্রগতির গড় ছিল মাত্র ৫০ থেকে ৯০ মিটার। ২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে যুদ্ধের সামরিক পরিস্থিতিও মস্কোর জন্য একমুখী সাফল্যের ছবি দিচ্ছে না। এই যুদ্ধের ফলাফল শুধু কত বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড কার নিয়ন্ত্রণে থাকল, তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি
ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ রোধ করার মূল লক্ষ্য থাকলেও যুদ্ধের ফলে এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া ঘটেছে। ফিনল্যান্ড ২০২৩ সালের এপ্রিলে এবং সুইডেন ২০২৪ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাটোতে যোগ দেয়, যার ফলে রাশিয়ার পশ্চিম সীমান্তে ন্যাটোর উপস্থিতি দ্বিগুণ হয়েছে। কার্নেগি এনডাওমেন্টের ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি মস্কোর দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অবস্থানকে অত্যন্ত ভঙ্গুর ও জটিল করে তুলেছে।
একইভাবে ইউরোপের দীর্ঘদিনের জ্বালানি বাজার হারিয়ে রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। জার্মান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ২০২৫ ও ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ বলছে, জ্বালানি রপ্তানির জন্য বিকল্প এশীয় বাজারের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক একা হয়ে পড়া রাশিয়ার কৌশলগত প্রভাবকে বহুগুণ হ্রাস করেছে। ২০২৪ সালে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং ককেশাস অঞ্চলে প্রভাব হারানোর ঘটনা রাশিয়ার বৈশ্বিক সামরিক ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। যুদ্ধের বিরোধী বক্তব্য ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ফলে বিকল্প রাজনৈতিক বয়ানের পরিসর সংকুচিত হয়েছে। বিকল্প সরবরাহকারী, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং নতুন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়।

















